রামকিশোর ভট্টাচার্য

রামকিশোরভট্টাচার্য

জন্ম:- ৬ই জুন ১৯৫৮ সালে জন্ম ৷মূলত কবিতাই ভালোবাসা ৷ প্রবন্ধ, গল্প ও ছোটোদের জন্যেও অনেক লেখা আছে ৷ মোট ১২ টি কাব্যগ্রন্থ ও চারটি  ছড়াগ্রন্থ আছে ৷ দুটি অনুবাদ কাব্যগ্রন্থ আছে ৷

 প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:-নতুন জলের গন্ধ,স্বপ্নপূরণ সিলেবাসগুলি,ইমন মনের বিলাসখানি,

একতারায় নির্বাচিত রামকিশোর, পাতাঘুঙুরের ছায়ালিপি ইত্যাদি ৷ আপাত শেষ কাব্যগ্রন্থ "নির্জন কোমল ঋষভ"

অনুবাদ গ্রন্থ:-Dream Sequence & Snake Ladder ,Songs of Mohenzodoro.





বিশেষ প্রবন্ধ:- স্মৃতিচারণে শ্রদ্ধাঞ্জলি

কবি রামকিশোর ভট্টাচার্য




কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু


আমাকে চমকে দিয়ে কলকাতার এক বিখ্যাত কর্পোরেট হাসপাতলে ভর্তি করা হয়েছিল বুদ্ধকে। শুনলাম হার্টে ব্লক আছে তার। মাত্র কয়েকদিন আগেই দুপুরে আমাদের কত কথা হয়েছিল। আমার বাড়ির বারান্দায় বসে খবরটা শুনে ভিতরে ভিতরে একটা আশঙ্কা দানা বাঁধছিল। মনে হচ্ছিল কত বড় একটা হৃদয়ের মানুষের হার্টে ব্লক আসে কি করে! ১১ ই ডিসেম্বর২০২০,অগ্রহায়ণ মাসের ২৫ তারিখ সকালে বাইরে বেশ কুয়াশা ছিল।৯-৩০ নাগাদ খবর পেলাম বুদ্ধর হার্টে সকালেই স্টেইন বসে গেছে। ছেলে সৈকতের সঙ্গে কথা বলেছে ফোনে। কোনো অসুবিধে নেই। একদিন পরেই ছেড়ে দেয়া হবে। বাইরে কুয়াশাটা কেটে যাচ্ছে মনে হলো। ঠিক বেলা ১১ টায় ফোন পেলাম আমার সহোদরসম,আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু বুদ্ধ চলে গেছে।


এত বড় মানসিক ধাক্কা সহ্য করতে পারিনি আমি।বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমি আবার ফোন করে যখন নিশ্চিত হলাম তখন আমার দু'চোখ বারবার মুছেও শান্ত রাখতে পারছিলাম না। এমন করে কি চলে যেতে হয়। পরে মনে হচ্ছিল যত বড় কর্পোরেট হাসপাতালেই হোক না কেন নিশ্চয় কোথাও গাফিলতি ছিল। পরে আমার বিশিষ্ট কিছু চিকিৎসক বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করে দেখেছি তাদের বক্তব্য অনুযায়ী আমার ধারণা যে খুব অমুলক তা নয়। তাই বার বার মনে হচ্ছে এটা কি বুদ্ধের চলে যাওয়া, নাকি চিকিৎসা-বিভ্রাটে পাঠিয়ে দেওয়া হলো অকালে।



ডক্টর বুদ্ধদেব বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশিষ্ট নজরুল গবেষক। নজরুল বান্ধব প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়ের স্নেহধন্য। সে ছিল আটের দশক। প্রাণতোষদা তখন শেওড়াফুলি সরকার বাগানে থাকতেন। বুদ্ধ একদিন আমায় বলল চলো তোমার আজ নিয়ে যাই কবি নজরুল ইসলামের বন্ধুর কাছে। গিয়ে অবাক হয়ে দেখলাম সেই প্রবীণ নাতিদীর্ঘ মানুষটির বুদ্ধ সম্পর্কে কী গভীর ভালোবাসা। দুই প্রবীণ নবীনের একে অপরের প্রতি অন্তরের শ্রদ্ধা দেখতে দেখতে বুঝতে পারছিলাম বুদ্ধ কত বড় মাপের মানুষ। তারপর বহু বার গিয়েছি প্রাণতোষদার কাছে।বুদ্ধ সম্পর্কে ওনার নিবিড় অন্তর্পাঠ দেখেছি। দেখেছি অনুজের প্রতি প্রবীণ অগ্রজের গভীর প্রত্যয়। নজরুলকে নিয়ে কাজ করার সময় তাই প্রাণতোষদার বহু সহযোগিতা পেয়েছিল বুদ্ধ। পরবর্তীকালে প্রাণতোষদাকে নিয়ে একটা প্রবন্ধের বই লিখেছিলো 'বিপ্লবী ও কবি প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়'। বইটি প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়কে বিস্তারিতভাবে জানতে সাহায্য করে। গবেষণাকালে অসহযোগিতাও কম হয়নি তার সঙ্গে। এটা বোধহয় আমাদের স্বভাব দোষ। নরম মাটিতে আঁচড় কাটতে আমরা বেশি পছন্দ করি। চাকরি জীবনের শেষে এসেও সে নানা অযোগ্য মানুষের অত্যাচার সহ্য করেছিল যা আমার বাড়ি এসে দুঃখ করে বলতো "সামনের মুখগুলোর চেয়ে আমি বেশি ভয় পাই মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মুখগুলো"। তবু ২০০৫ সালে যেদিন তার গবেষণার স্বীকৃতি পেল তারপর আমরা দুজনে আমার বাড়িতে তা উদযাপন করেছিলাম অতি সাধারণ ভাবে। "নজরুল সাহিত্যে লৌকিক জীবন ও সংস্কৃতি" বুদ্ধের গবেষণাগ্রন্থ। সেদিন আহ্লাদের প্রকাশ ছিল না একটুও, শুধু শান্ত সৌম্য মুখটায় ছিল স্বর্গীয় আনন্দের আলো।


সদ্য বিয়ে করে অফিস ছুটির পর মাঝে মাঝে বৌ রঞ্জনাকে নিয়ে সাইকেলের সামনে বসিয়ে আমাদের বাড়িতে আসত। ফিরত রাত দশটা নাগাদ। আমরা চারজন তুমুল আড্ডা দিতাম। বুদ্ধ রঞ্জনাকে খুব মিষ্টি করে খুকুমণি বলেই ডাকতো। সেই নিয়ে আমরা দুজনে কত মজা করতাম। রঞ্জনা খুবই গুণী মেয়ে। খুব ভালো গান গায়। সেই সব কথা, গানের আনন্দসন্ধ্যা আর ফিরে আসবে না কোনদিনই। বুদ্ধ থাকতো শ্রীরামপুরের চাতরা দোলতলার কাছে দত্তপাড়ায়। পাড়ায় এই শান্তশিষ্ট মানুষটি 'গরমদা' নামে পরিচিত ছিল। পাড়ার প্রত্যেকটি মানুষ তাকে যে কত সম্মান করতো ভালোবাসতো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বুদ্ধ কোন জনপ্রিয় নেতা ছিল না। কিন্তু সে যেদিন মারা গেল তার পাড়ায় গিয়ে দেখেছি বিভিন্ন বাড়ির দেওয়াল, তার বাড়ির সামনে ক্লাব 'সবুজ সংঘ'র দেয়ালে বড় বড় করে লেখা-- "আমাদের 'গরমদা'র মৃত্যুতে আমরা শোকাহত।" বিভিন্ন পাড়ায় তো কত লোক মারা যায়। এভাবে কতজনকেই বা স্মরণ করা হয়। আসলে বুদ্ধর জীবনযাত্রা তো দুর্বোধ্য ছিল না। ইথারে আবদ্ধ তার ভাবনা চিন্তাগুলো অনায়াসে পৌঁছে যেত সব রকম মানুষের কাছে। ফলে সে নিজের আচরণে মানুষের মনের কাছে পৌঁছে যেত অনায়াসে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কর্মী ছিল সে। রাইটার্স বিল্ডিং-এ ছিল তার অফিস। বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও কবি তপন বন্দ্যোপাধ্যায় তখন তথ্য সংস্কৃতি বিভাগের সচিব। সংস্কৃতি বিভাগের তপনদার সহকারি ছিল সে। তপনদা সম্পর্কে তার কত নিবিড় শ্রদ্ধা দেখেছি। কথা প্রসঙ্গে তপনদাও বুদ্ধের সম্পর্কে কত উচ্চধারণা পোষণ করেন তাও লক্ষ্য করেছি। বুদ্ধের কাছে শুনেছিলাম ও কথাকার তপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে রাত আটটা প্রবন্ধ লিখেছিল। যা হয়ত একটা বই হয়ে যাবে।

এই লেখা যখন লিখছি মনে ভেসে উঠছে বুদ্ধের বিভিন্ন প্রবন্ধের কথা আমি। আমি দেখেছি বুদ্ধের বিভিন্ন লেখা অতি মনোযোগ নিয়ে নির্জনে পড়তে পড়তে নিজেকে সমৃদ্ধ করে নেওয়া যায়। যৌবন বয়স থেকেই বুদ্ধ কবিতা লিখত অথচ কোনদিনই নিজেকে কবি বলতে চাইনি। কবি যশোপ্রার্থীও ছিল না।
তার তিনটে কবিতার বই 'আনন্দ কাননে এক প্রবীণ তাপস', 'এই দীর্ঘ পথ হাঁটা', 'রবীন্দ্রনাথ অন্য চোখে'। একদিন আমি একটু ঠাট্টা করেই প্রশ্ন করেছিলাম, তোমার কবিতা আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু তোমার কাব্যগ্রন্থগুলোর এরকম নাম দাও কেন? একটু ক্যাচিং, আধুনিক নাম দাও না কেন? তোমার নিজস্ব সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে কি মনে হয় না একটু অন্যরকম নাম হলে ভালো হতো। একটু মৃদু হেসে চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে বলেছিল, আমার কবিতা তো আমার নিজের জন্যই লেখা। আমার অনুভূতির শব্দমালা। অন্তর্গত কথন।



পারিবারিকভাবে বেলুড়মঠে দীক্ষিত ছিল। 'বিজ্ঞান বেদান্ত ও রামকৃষ্ণ ভাবান্দোলন', 'প্রতিদিনের জীবনে শ্রীরামকৃষ্ণ', 'শ্রীশ্রী মা স্বামী বিবেকানন্দ' 'স্বামী বিবেকানন্দ আজকের ভারত' আর 'জননী সারদা' তার লেখা এই চারটে বই তার নিজস্ব চিন্তা ধারাকে বুঝতে সাহায্য করে। নিরন্তর চর্চা আর তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগে সে ভাষায় সমৃদ্ধ হয়েছিল বলেই মনে করত। পাশাপাশি অনুবাদ করেছে প্রচুর। অনুবাদ-চর্চায় কম দক্ষ ছিল না সে। বেশ কিছু মানুষ বুদ্ধকে দিয়ে অনুবাদ করিয়েছেন। কিন্তু তাদের বই পরে ছাপা হয়েছে সেই মানুষটির নামে, বুদ্ধের নাম নেই কোথাও। বুদ্ধদেব শান্ত মনে মেনে নিয়েছে। আমি প্রতিবাদ করলে মৃদু হেসে বলেছে, আরে আসল লেখাটা তো তারই। আমি তো অনুবাদ করেছি মাত্র। অনুবাদক হিসেবে আমার নামটা দিলে ভালো লাগতো। তবে দিল না যখন তাতে আমার বলার কিছুই নেই। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম তার সেই নির্লিপ্ততার দিকে। সেখানে নেই কোন আক্ষেপ বা কষ্টের ছাপ। সব সময় তার আচরণে বিনয় প্রকাশ পেত। তারমধ্যে অহমিকা দেখিনি। এভাবেই কত শিক্ষা দিয়ে গেছে আমাকে। আজ তা বারবার মনে আসছে।


যেদিন শেষ বার এসেছিল সেদিন বলেছিল দুটি বইয়ের কথা। কাজ শেষ হয়েছে কিনা এখনো জানিনা। বলেছিল প্রকাশের পথে। আমি বলেছিলাম এত বড় কাজ, এত এনার্জি দিচ্ছ অবশ্যই পারিশ্রমিক নেবে। মৃদু হেসে বলেছিল হুম ঠিক বলেছ। আমি অবশ্যই বলব। বলেছিল কিনা জানি না। বই দুটি ইংরেজি অনুবাদ 'শ্রীকৃষ্ণ' এবং 'চিনিটুস্কু'। বই দুটির লেখক যথাক্রমে গৌরচন্দ্র সাহা ও লক্ষ্মী চক্রবর্তী।


বুদ্ধর কাব্যবোধকে আমি খুব সম্মান করি। আমার আপাত শেষ কবিতার বই "নির্জন কোমল ঋষভ"- এর কবিতাগুলো নির্বাচন করেছিল এবং প্রুফ দেখেছিল। যেন কবিতার শিকড়ে শিকড়ে ঢুকে যেত। প্রভাত চৌধুরী সম্পাদিত কবিতা পাক্ষিক পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিল শ্রীরামপুরে তার বাড়িতে প্রভাতদা কে নিয়ে তার বাড়িতেইও প্রথম আড্ডা হয়। তারপর আমার বাড়িতে। সে সব আড্ডার দিন স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল। 


বুদ্ধিজীবীর বুদ্ধিবাজিতে বুদ্ধ ছিল না কোনদিনই। ইন্টেলেকচুয়ালিটির অহংকে একদম পাশে আসতে দেয়নি সে। অথচ বক্তা হিসেবে অসাধারণ ছিল। যেকোনো বিষয়ে তার বক্তৃতা স্মৃতিতে গুনগুন করত। হয়তো কোথাও কোনো একটি বিষয়ে তাকে হঠাৎ বলার জন্য যদি অনুরোধ করা হয়েছে। ঘন্টাখানেক আগে বললেও দেখেছি কি অনায়াসে একঘন্টা সেই বিষয়ে বলে দিয়ে চলে এসেছে। কখনো কখনো একই মঞ্চে বসে আমি অবাক হয়ে শুনেছি। ভেবেছি দেবী সরস্বতীর আশীর্বাদ ছাড়া এ সম্ভব নয়।


আজ বুদ্ধ নেই। আমার এই মফস্বল শহরে বুদ্ধদেবের মৃত্যু এক নক্ষত্র পতন। বুদ্ধই প্রথম বলেছিল আমার শহর শ্রীরামপুরকে আমরা আদর করে ডাকবো 'অক্ষরশহর'। আজ এক শূন্যতাতা মাঝে মাঝে এসে বসে। তার সঙ্গেও কথা বলি। এই কালও এসেছিল সেই বিনয়ী শূন্যতা। বাইরে তখন শীতের হাওয়া। আমি জিজ্ঞেস করলাম 'কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু ছেড়ে যাইবা যদি'। দেখলাম ঘরের আলোটা মিটমিট করে উঠলো। হয়তো মনের ভুল-- হয়তো--




Comments

Popular posts from this blog

মিহির সরকার

কামাল আহসান

রিয়াদ হায়দার