সৈয়দ হাসমত জালাল

সৈয়দ  হাসমত জালাল

জন্ম:- ১৯৫৭ সালের ১২ জুলাই, মুর্শিদাবাদ জেলার খোশবাসপুর গ্রামে। পারিবারিকভাবেই সাহিত্যচর্চার পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা। স্কুলে ছাত্রাবস্থায় ছড়া-পদ্য দিয়ে লেখার শুরু। একাদশ শ্রেণীতে পড়ার সময় তাঁর প্রথম কবিতা বহরমপুর থেকে প্রকাশিত কবি মণীশ ঘটক সম্পাদিত'বর্তিকা' পত্রিকায় প্রকাশিত ও পুরস্কৃত হয়।ভারতীয় বিমান বাহিনীতে যোগ দিয়ে ভারতের বিভিন্ন শহরে ও সীমান্তে যৌবন যাপন করেছেন জালাল। সত্তর দশকের শেষভাগে দিল্লির সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।১৯৯০ সাল থেকে কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু। কর্পোরেট অফিসের প্রশাসন সামলেছেন দক্ষতার সঙ্গে। পরে পুরোপুরি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে অংশ নিয়েছেন বহু সেমিনারে, সাহিত্য সম্মেলনে এবং পেয়েছেন বহু সম্মাননা, সংবর্ধনা ও পুরস্কার। তাঁর 'ক্ষুধাশিল্পের দেশ' কবিতাগ্রন্থটি ২০০২ সালে সম্মানিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বাংলা আকাদেমি পুরস্কারে এবং ২০১২ সালে বিষ্ণু দে পুরস্কারে।




বিশেষ প্রবন্ধ:-স্মৃতিচারণে শ্রদ্ধাঞ্জলি

সৈয়দ হাসমত জালাল



গভীর নির্জন পথে চলে গেলেন সুধীর চক্রবর্তী


বাঙালির চিন্তা ও বুদ্ধিচর্চার আকাশ থেকে খসে পড়ল আরও এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি সুধীর চক্রবর্তী। রবীন্দ্রসঙ্গীত, বাংলা গান এবং লোকসংস্কৃতির একনিষ্ঠ গবেষক,অধ্যাপক  সুধীর চক্রবর্তী ৮৬ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন গত ১৫ডিসেম্বর। এক সাক্ষাৎকারে সুধীর চক্রবর্তী বলেছিলেন, ' 'আমার রবীন্দ্রনাথ আমাকে বলে যে দীর্ঘ জীবন হলো আশীর্বাদ।... দীর্ঘ জীবনকে আশীর্বাদস্বরূপ নিয়ে যেন প্রতিটাদিন এবং প্রতিটা ক্ষণকে ফলবান মনে করতে পারি।' দীর্ঘ জীবন এবং ফলবান জীবন তিনি কাটিয়ে গেলেন, এ কথা নিঃসংশয়েই বলা যায়। বাঙালি জীবনের ও সংস্কৃতির বিভিন্ন কাজের, গবেষণার মধ্যে  তিনি নিজের জীবনকে নিয়োজিত করেছিলেন সৃষ্টির গভীর বোধের উন্মোচনে। 


তাঁর শৈশবের কিছুটা সময় হাওড়ায় শিবপুরে কাটলেও নদীয়া জেলার দিগনগরে তাঁর পৈতৃক ভিটেয় এবং পরে কৃষ্ণনগর শহরে কেটেছে সমস্ত জীবন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে        উচ্চশিক্ষা শেষ করে অধ্যাপনা করেছেন প্রায় ৪০ বছর। কৃষ্ণনগর সরকারি কলেজেই মূলত, পরে কিছুদিন চন্দননগর কলেজেও। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক। কিন্তু তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র ছিল বিস্তৃত। রবীন্দ্রসঙ্গীত, বাউল-ফকির, সাহেবধনী, লালনপন্থা, কর্তাভজা প্রভৃতি বিষয়ে তিনি ছিলেন বিশেষজ্ঞ গবেষক।এসব বিষয়ে তিনি প্রায় ষাটেরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর লেখার বিশেষ গুণ তাঁর সাবলীল           বাচনভঙ্গিমা, গভীর রসবোধ আর সহজপাঠ্যতা। গভীর বিষয়কে সহজভাবে উপস্থাপন করার জন্যে যে গভীর প্রজ্ঞা ও নৈপুণ্যের প্রয়োজন, তা তাঁর ছিল। তিনি দশ বছর সম্পাদনা করেছেন 'ধ্রুবপদ' নামে একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য পত্রিকা। 



গত তিরিশ বছরে সুধীরদার সঙ্গে বিভিন্ন সাহিত্যসভা ও অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে আমার।তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতাও একসময় হয়ে উঠত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক আলোচনা। রবীন্দ্রসঙ্গীত বিষয়ে তাঁর আলোচনা আলোচনা গভীর আগ্রহের সঙ্গে শুনতাম। এ বিষয়ে তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ' গানের লীলার সেই কিনারে' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।


২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জামশেদপুরে নিখিলভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে আমন্ত্রিত ছিলাম। আমি আর কথাসাহিত্যিক সাধন চট্টোপাধ্যায় গিয়েছিলাম একসঙ্গে। রবীন্দ্রনাথের দেড়শোতম জন্মবর্ষ উপলক্ষে ছিল সেই অনুষ্ঠান। সেটা ছিল 'গীতাঞ্জলি' রচনারও একশো বছর। আমি আলোচনা করেছিলাম 'গীতাঞ্জলি'র গান ও রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মচেতনা নিয়ে। পরবর্তী অধিবেশনে দেখা হলো সুধীরদার সঙ্গে। তিনিও সেদিন 'গীতাঞ্জলি'র বিশেষ কয়েকটি গান নিয়ে বলেছিলেন। আর সেই গানগুলি গেয়েছিলেন তাঁর এক ছাত্র। অনুষ্ঠানশেষে অনেকটা সময় আমরা কথা বলেছিলাম এ বিষয়ে। 


২০১৩ সালে 'সিরাজ আকাদেমি'র অনুষ্ঠানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম বিশেষ অতিথি হিসেবে। কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের প্রয়াণের পর তৈরি হয়েছে এই 'সিরাজ আকাদেমি'। সে বছর 'সিরাজ আকাদেমি'র পক্ষ থেকে পুরস্কার প্রদান করা হয় কথাসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে। সেখানে 'সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ও লোকসংস্কৃতি' বিষয়ে অত্যন্ত মনোজ্ঞ বক্তৃতা দিয়েছিলেন তিনি।



তাঁর প্রথম গ্রন্থ 'গানের লীলার সেই কিনারে' এবং 'গভীর নির্জন পথে', 'নির্জন এককের গান: রবীন্দ্রসঙ্গীত' ইত্যাদি গ্রন্থের পাশাপাশি 'সাহেবধনী সম্প্রদায় ও তাদের গান', 'পশ্চিমবঙ্গের মেলামহোৎসব', 'ব্রাত্য লোকায়ত লালন', 'বাংলা দেহতত্ত্বের গান', 'বাউল ফকির কথা', 'দ্বিজেন্দ্রলাল রায়: স্মরণ বিস্মরণ' ইত্যাদি গ্রন্থগুলি পাঠকমহলে অত্যন্ত সমাদৃত। 'বাউল ফকির কথা' গ্রন্থের জন্যে ২০০৪ সালে তিনি পেয়েছিলেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সতীর্থ হিসেবে পেয়েছিলেন শিশিরকুমার দাশ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের মতো মেধাবী কবিদের। বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেন তাঁর এক বছরের সিনিয়র শঙ্খ ঘোষকে। প্রয়াত শিশিরকুমার দাশ ।কবি, অধ্যাপক এবং গবেষক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন  যেমন, তেমনই শঙ্খ ঘোষের কবিখ্যাতি ও সম্মান দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। বাঙালির শিক্ষা, বুদ্ধি ও মননচর্চার ক্ষেত্রে এইসব কবি, অধ্যাপক ও গবেষকের যে অবদান, তা-ই তো বাঙালিকে সম্পদশালী করেছে। 


মাত্র কয়েকদিন আগেই প্রয়াত হয়েছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের মতো খ্যাতিমান দুই বাঙালি।এবার সেই পথ ধরে চলে গেলেন সুধীর চক্রবর্তী। কৃষ্ণনগরে থাকতেন বলে তিনি নিজেকে 'কৃষ্ণনাগরিক' বলতেন। গভীর নির্জন পথে চলে গেলেন আলোকোজ্জ্বল এই কৃষ্ণনাগরিক, বাংলার চিন্তাজগতকে আরও একটু শূন্য করে দিয়ে।


















Comments

Popular posts from this blog

মিহির সরকার

কামাল আহসান

রিয়াদ হায়দার