মাসুদুল হক
মাসুদুল হক
জন্ম:-জানুয়ারি ১৯৬৮ সালে।বাংলা একাডেমির রিসার্স-ফেলো হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা থেকে পি.এইচ.ডি সম্পন্ন করেছেন ২০০৪ সালে। বাংলাদেশের সরকারি কলেজে দর্শন বিভাগে অধ্যাপনায় নিয়োজিত। তার কবিতা তাইওয়ানিজ, চীনা, নেপালি, আজারবইজানিজ, তার্কি, রোমানিয়ান ,আরবি,ইতালীয়,অসমীয় ও স্পেনীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
ইংরেজি ভাষায় বিশ্বের বিখ্যাত জার্নাল ও ব্লগগুলোতে নিয়মিত কবিতা লিখে যাচ্ছেন। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে তিনি ইংল্যান্ডের "THE POET" পত্রিকা কর্তৃক "International Poet of the Week"-এ ভূষিত হয়েছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৫টি। বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার (২০১১); চিহ্ন পুরস্কার (২০১৩); দিনাজপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি গুণীজন সম্মাননা (২০১৪) অর্জন করেছেন।
উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ : ১. টেনে যাচ্ছি কালের গুণ, ২. ধ্বনিময় পালক, ৩. ধাঁধাশীল ছায়া, ৪. জন্মান্ধের স্বপ্ন, ৫. সার্কাসের মেয়ে ও অন্যান্য কবিতা, ৬. The shadow of illusion, ৭. Blind Man's Dream.
প্রবন্ধ ১. বাংলাদেশের কবিতার নন্দনতত্ত্ব ২.হাজার বছরের বাংলা কবিতা ৩. জীবনানন্দ দাশ ও অন্যান্য ৪. বাংলা সাহিত্যে নারী ৫. বাংলা উপন্যাস অধ্যয়ন।
অনুবাদ : ১. চৌদল ঐকতান, মূল:টি. এস. এলিয়ট ২. ধূসর বুধবার, মূল: টি. এস. এলিয়ে ৩. বালি ও ফেনা,মূল: কাহলিল জাফরান প্রভৃতি।
নব্বইয়ের নহবতের প্রবন্ধ: বাংলাদেশ
কবি ও প্রাবন্ধিক মাসুদুল হক
নব্বই দশকের কবিতা: পাঠ ও মূল্যায়ন
আধুনিক বাংলা কবিতার কালানুক্রমিক ধারায় নব্বইয়ের দশক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পটভূমিকায় রয়েছে বাংলাদেশের সুদীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস। স্বাধীনতা লাভের পর বিরাজিত তৎকালীন অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে স্বাধীন ধনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক বিকাশের দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ-বিক্ষুব্ধতার পর নতুন করে দেশ নির্মাণের নিরিখে দেখা দিল আপাত অর্থনৈতিক মানের ক্রমাবনতি, খাদ্যাভাব, শ্রমিক অসন্তোষ, বেকারী; অন্যদিকে ৭৫-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ব্যারাকের রাজনীতি, শিল্পায়ণ ইত্যাদির অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ জাতীয় বুর্জোয়াদের শক্তিবৃদ্ধি; সাম্যবাদে বিশ্বাসী অসংখ্যা রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মীর উপর দমনপীড়ন। দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচনের নামে ‘হা-না’ ভোটরীতির প্রহসন। তারপর এক ব্যারাক কর্মকর্তা থেকে সুকৌশলে অন্য কর্তার হাতবদল, মাঝে রক্তের পর রক্তধারা। আবার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মীর উপর দমনপীড়ন, বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে পররাষ্ট্রিক ক্ষেত্রে ক্রমাবনতি, ইত্যাদি দেশীয় রাজনীতির বৈশিষ্ট্য। বৈশ্বিক ক্ষেত্রে প্রাত্যহিক জীবনে কম্পিউটার ব্যবহার, ডিস-এন্টেনা, নতুন চ্যানেল, দুই জার্মান একত্রিকরণ, রাশিয়ার ভাঙ্গন, ইউরোপে মুক্তবাজার অর্থনীতি, আমেরিকার মঙ্গল গ্রহে পাথ-ফাইন্ডার কম্পিউটার অবতরণ ইত্যাদি যুগগত জটিলতাকে আরো তীব্র করে তুলেছে।
নব্বইয়ের পূর্বে প্রকাশিত বাংলাদেশের সাহিত্যে কবিকণ্ঠ, স্বাক্ষর, সমকাল, সুন্দরম, বক্তব্য, পূর্বমেঘ, পরিক্রম, সাম্প্রতিক, প্রতিধ্বনি, ছোটগল্প, শ্রাবস্তী, কালবেলা, বিপ্রতীক, চারিত্র, শিল্পকলা, সূচীপত্র, কালস্রোত, আসন্ন, অলক্ত, চিরকুট, কিংশুক, যুবরাজ, কথা, কবিপত্র, স্বরলিপি, কবিতালিপি, সংবর্ত, কপোতাক্ষ,অরণি, অচিরা, গল্পপত্র, উরকাল, উপকণ্ঠ, ছায়াপথ, অনুকাল, অর্কেস্ট্রা, রূপম, কিছুধ্বনি, সৃজনী, সম্মোহনী, কবি, দীপংকর প্রভৃতি সাহিত্য পত্রিকাসমূহ প্রভূত প্রভাব রেখেছিল। তারপর বহুদিন বিশুদ্ধ সাহিত্য কাগজের অভাবের পর আবির্ভূত হল নতুন দর্শনাবিষ্ট ছোট কাগজের ধারণা; কমিটমেন্ট এর বিষয়-আশয়। ‘লিটল ম্যাগাজিন’ নাম নিয়ে প্রকাশ পেল বহুপত্রিকা। আশির দশকের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য লিটল ম্যাগাজিন হচ্ছে গা-ীব, অনিন্দ্য, উত্তরণ, শব্দায়ন, প্রেক্ষিত, ঈক্ষণ, সংবেদ, চর্যাপদ, কম্পাস, চালচিত্র, লিটল ম্যাগাজিন, লিরিক, নিসর্গ, চিন্তা, জলদ, নান্দীপাঠ, একবিংশ, প্রসূণ, পেঁচা, নদী, প্রান্ত, কারুজ, অরুন্ধুতী, নার্সিসাস, পরাবাস্তব, প্রকৃত পাখির গান, খুন, প্রমা, ক্যাথারসিস, শতবর্ষী প্রভৃতি।
আশির দশকের লিটল ম্যাগ আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে; নব্বই দশকে এসে। সেই দশকের লিটল ম্যাগগুলোর পাশাপাশি যুক্ত হল নব্বই দশকে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিন শব্দপাঠ, দ্রষ্টব্য, সূচক, দ্বিতীয় চিন্তা, খোয়াব, ঘাস, মধ্যাহ্ন, দ্রাবিড়, শুদ্ধস্বর, প্যারাডাইম, পূর্ণদৈর্ঘ্য, নৃ, ফৃ, স্বাতন্ত্র্য, দামোদর, ব্রহ্মপুত্র, মন্ত্র, মঙ্গলসন্ধ্যা, নন্দন, প্রতিশিল্প, সুমেশ্বরী, বিবিধ, অরিন্দম, পত্তর, কালোকাগজ, আড্ডারু, বিকাশ, সুদর্শনচক্র, শব্দশিল্প, নন্দন, কবিতা নয় কালপ্রপাত, যথামৃত, ছাপাখানা, গ্রন্থী, চশমা, নোয়াজার্ক, ১৪০০, ঋতপত্র, সুবর্ণরেখা, ছাঁট কাগজের মলাট, দ্যুতি, দ, নদী পাখি মেঘ, ঘণ্টা, অম্বিকা, সংগা, তর্জনী, জীবনানন্দ, নুন, সাহিত্যাগ্রহী, সহজিয়া, পুস্পকরথ, সমজ্জ্বল সুবাতাস, ব্যাস, বিবর, উচক্রা, বৈশস্পায়ন, হৃদী, মাতালের হাসি, অক্ষর, সে, ধাবমান, গদ্য, ঐকতান, দ্রাঘিমা, চোখ, সাঁতার, মেঘ, অনুশীলন, সম্পূর্ণ, ভ্রুণ, মস্তক, অনুধ্যান, ধলাই, কফিন টেক্সট, হঠাৎ রোদ্দুর প্রভৃতি। এই সাহিত্যকাগজগুলোর লেখক ও কবিরা কেউ কেউ কমিটমেন্টের ব্যাপারে একদম আপোষহীন। এদেরই ভেতরে আবার কেউ কেউ মার্ক্সীয় তত্ত্বকেই সাহিত্যসৃষ্টির ভিত্তি রূপে গ্রহণ করলেন। আবার অনেকে গ্রহণ করেছেন আবেগাশ্রিত, সমাজ নিরপেক্ষ বিশুদ্ধ সাহিত্য। অনেকে আবার বিজ্ঞান, দর্শন ও ইতিহাসের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন। কেউ কেউ ভাষার সার্বজনীন রূপ উদ্ধারে নিমগ্ন। আবার অনেকে অধিদৈবিক (সবঃধঢ়যুংরপধষ) কবিতা লেখার পাশাপাশি ইসলামি রেনাসাঁকে জাগ্রত রাখার চেষ্টায় মত্ত।
নব্বই দশকের কবিতায় জটিল দায়বদ্ধ ও গদ্যকবিতার সঙ্গে শিল্পগুণ সমৃদ্ধ, পরিপার্শ্ববর্জিত সমাজনিরপেক্ষ ঐতিহ্যে অন্তর্মুখীন কবিতার ধারা প্রবাহিত। এদের কবিতায় প্রচল ছন্দের বাইরে বেরিয়ে নতুন সমীক্ষাধর্মী একটি গদ্য ভাষ্য-ধারার কাব্যশৈলী নির্মাণের প্রবণতা দেখা যায়; যেখানে ধ্বনিময়তার প্রাবল্য স্পষ্ট। তবে, নব্বই দশকের কবিতায় আদর্শবোধের উদ্দেশ্যহীনতা, ব্যক্তিগত অনুভূতি, কবিকৃতির উগ্রতা, নৈঃসঙ্গ্যবোধ প্রভৃতির প্রকটতাও দেখা যায়।
পাঠ ও মূল্যায়নের সুবিধার্থে নব্বই দশকের কবিতার কিছু প্রবণতা উল্লেখ করা হল:
১.এ দশকের কবিতায় কবিরা অনিবার্য বক্তব্য, অভিব্যক্তি ও আঙ্গিকের অনুপস্থিতি রাখেন। ফলে তাদের কবিতাকে কৃত্রিম বলে মনে হয়।২.এই দশকের কবিদের কেউ কেউ পাঠকের সঙ্গে ন্যূনতম যোগাযোগ রাখতে চান না, ফলে এই দশকের কবিতা অনেক ক্ষেত্রেই স্বেচ্ছাচারিতায় আক্রান্ত।৩.কবিতার পুরো কাঠামো নিয়ে ভাবেন না কোনো কোনো কবি। কাঠামো প্রায়ই স্পষ্ট থাকে না কবিতায়। সেক্ষেত্রে শব্দ, উপমা ও বক্তব্য প্রথা-বিরোধী হয়ে ওঠে কারো কারো কবিতায়।৪.কবিতায় দ্যোতনা সৃষ্টির দিকে আগ্রহ নেই এই দশকের অনেক কবির।৫.কৃত্রিমতা ও নাটকীয়তা এ দশকের কবিতায় উপস্থিত, স্বাভাবিকতা ততখানি নেই।৬.কবিতাকে দুরূহ ও দুর্বোধ্য করার প্রবণতা লক্ষণীয় এই দশকের কবিতায়।৭.এই দশকের কবিদের কবিতায় অবক্ষয়প্রীতি প্রকরণ হিসেবে উপস্থিত।৮.জাদুবাস্তবতা ও অস্তিত্ববাদী চেতনা নিয়ে কেউ কেউ কবিতায় কাজ করেন। ৯.লোকঐতিহ্য আর সংগীতধর্মীতা দিয়ে কবিতা নির্মাণের প্রয়াস লক্ষণীয়।১০.ক্ষয়ক্লিষ্ট রোমান্টিক আত্ম-উন্মোচন দেখা যায় কবিতার প্রকরণে।১১.বিজ্ঞানমনস্কতা, ভাষা বিশ্লেষণ ও যুক্তিবাক্যের গঠনরীতির অনুসরণ লক্ষণীয়।১২.আত্মচৈতন্য আর অহং-বোধ-এর প্রকাশ দেখা যায়।১৩.কবিতায় স্থান ও কালের প্রভেদ ভাঙা; সময়হীন সময়কে উপস্থাপন।১৪.কবিতায় শব্দ, উপমা ও প্রতীক প্রয়োগে ব্যবহারিক জীবন ও বস্তুজগতের প্রতিফলন লক্ষণীয়।১৫. কবিতায় ইম্প্রেশনিস্ট ও ইমেজিস্ট ধারার প্রবর্তন।১৬. ধর্ম দর্শন ও সমাজমনস্ক ধারার পুনর্ব্যবহার।১৭.কবিতায় সরাসরি রাজনৈতিক চেতনা অনুপস্থিত। তবে ছড়া সাহিত্যে মিছিল, মিটিং আর রাজনৈতিক বক্তব্য লক্ষণীয়।১৮. মরমী ও আধ্যাত্মিক চেতনার প্রতিফলন।১৯.প্রকৃতিবাদী চেতনার নতুন প্রয়োগের ধারা সৃষ্টি।২০. উত্তরাধুনিক চিত্রকল্প সৃজনের ধারা। ২১. কথোপকথনের রীতি প্রবর্তন।২২. আর্থ-সামাজিক-অর্থনৈতিক চেতনার প্রকাশ।২৩. ফটোগ্রাফিক ন্যারেশন তৈরির প্রয়াস।২৪. প্রতীকবাদ, পরাবাস্তবাদ, চেতনার অন্তঃশীল প্রবাহ ও মনোবিকলন তত্ত্বের প্রয়োগ।২৫. গণিত, জ্যামিতি ও বিজ্ঞানের প্রয়োগ। ২৬.জীবনানন্দীয় প্রকরণের নব ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ।২৭. মনঃসমীক্ষণ ও কামচেতনার প্রয়োগ।২৮. আত্মজৈবনিক ধারার প্রায়োগ।২৯. অবক্ষয়প্রীতির পুনর্বিন্যাস।৩০. নিসর্গ ও প্রকৃতিবাদী চেতনার পুনর্মূল্যায়ন।৩১. উপযোগবাদী ও প্রয়োগবাদী দর্শনের ধারা অনুসরণ।৩২. প্রেম, সৌ ন্দর্য ও মানবতাবাদের প্রয়োগ।৩৩. মিথ, পুরাণে বিনির্মাণতত্ত্বের প্রয়োগ।৩৪. ঐতিহ্য, ইতিহাস ও মিথের ব্যবহার।
২.
শামীম কবীর:(১৯৭১-১৯৯৫)-এর কাব্যগ্রন্থ ‘শামীম কবীর সমগ্র’ (১৯৯৭)নব্বই দশকের একটি বিশেষ সংযোজন। আলোচ্য কাব্যগ্রন্থেই কবির প্রায় সমগ্র কাব্যচেতনার বীজ নিহিত। শামীমের কবিতার আঙ্গিক ও দৃষ্টিভঙ্গির বিশিষ্টতা রয়েছে। প্রথম থেকেই বিশিষ্ট মানস ও কাব্যরীতিতে তিনি তার কবিতাকে ধাবিত করেন। তার আধুনিকতা আলো অন্ধকারের সমন্বয় আর তা থেকে উজ্জীবনের আর্তি। যে-কোনো অব্যর্থ সন্ধানী কবির কবিকর্মকে শেষ পর্যন্ত কবিতা হতে হয়। কবিতায় কী হলে বা কী থাকলে খাঁটি কবিতা কবিতা হিসেবে বিবেচিত হবে, তা একটা বিতর্কিত সনাতন প্রশ্ন। কিন্তু যতদিন কবিতা থাকবে ততদিন প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিকভাবেই বারবার উঠবে। ‘রসাত্মক বাক্য হচ্ছে কাব্য’ এই শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত যতই জোরালো হোক, আধুনিক পাঠক ও সমালোচক তাতে স্বস্তি ও তৃপ্তি পায় না। এই প্রাজ্ঞকূট সংজ্ঞার্থে, এই অতীব পরিচ্ছন্ন মতবাদে, বর্তমান সময়ের টেনশন-পীড়িত প্রশ্নদীর্ণ সামাজিক মানুষ ঠিক আশ্বস্ত বোধ করে না। কেননা সে তার নবার্জিত কাব্যসংস্কার ও কাব্যরুচির সঙ্গে এই সংজ্ঞার কোনো সুস্থ মিল খুঁজে পায় না। তারচেয়ে সে একথা ভাবতে ভালোবাসে যে, যথার্থ কবিতা তাকেই বলতে হবে যা চকিত চমকে মনকে স্পর্শ করে যায়। চৈতন্যে সাড়া জাগায় যা;সেই চকিত দোলা কখনও আসে ভাবের অভাবিত ব্যঞ্জনায়, কখনো মনোভঙ্গির অপ্রত্যাশিত খরতায়, কখনো-বা রূপকলার আকস্মিক জ্যোতির্ময়তায়। কোনো ভালো কবিতায় এই সবগুলোর শোভন উদ্যোগই যে থাকতে হবে, এমন কোনো আবশ্যিক শর্ত অবশ্য নেই। এদের যে-কোনো একটির অভিঘাতেই পাঠকের মনের উদ্ভাসন ঘটতে পারে, তার অভিজ্ঞতার পরিধি বিস্তৃততর হতে পারে। সেই প্রজ্বলন ও প্রসারণ পাঠকের মধ্যে ঘটিয়ে কবির বাক্যসৃষ্টি যথার্থ হয়ে ওঠে। শামীম কবিরের “মা’র সঙ্গে বাক্যলাপ” কবিতাটি নন্দনতাত্ত্বিক চেতনায় একটি উৎকৃষ্ট কবিতা।তার কবিতায় কাব্যগুণের সেই চকিত দোলা রয়েছে। শামীম কবীর লেখেন:
দেয়ালের চোখ নেই
কেবলই স্বচ্ছতা মাখা খাড়া
কতোকাল
আর এইখানে
মাঠের মধ্যম কোণে রোপিত রাখাল।
(মা’র সঙ্গে বাক্যালাপ)
আধুনিক বাংলা কবিতায় শুদ্ধিকৃত শোণিত ও উজ্জীবিত প্রাণের প্রাণময়তা সঞ্চারে তরুণ কবিদের প্রথাবিরোধী শব্দানুসন্ধান বরাবরই যে একটা চমকপ্রদ ভূমিকা নিয়েছে তার নিদর্শন শামীম কবীরের কবিতাতে রয়েছে। তার দেখা কবিমনস্ক চোখের অনুধাবনে সৃষ্টি হয় ‘দেয়ালের চোখ’। শব্দ দুটি একটি পদ(Term)-এ পরিণত হয়, তবে তা বাস্তবে ফিরে আসে এই-ভাবে ‘নেই’ এই নঞর্থকতার ভেতর দিয়ে। শামীম এমন অনেক পদ তৈরি করেছেন তার কবিতায়। ‘রোপিত রাখাল’ উপরিউক্ত পাঁচ লাইন শেষে যে ব্যঞ্জনা দেয় তা অসাধারণ। অবাক হয়ে আমরা লক্ষ করি একটা শব্দ ‘স্বচ্ছতা’। শব্দটি আমাদের চোখের কাছে থেকেও মনের কাছে ছিল না। অথচ এমন একটা তরতাজা লক্ষ্যভেদী শব্দ কী সহজেই না শামীম কবীর খুঁজে পেলেন ও অবলীলায় ব্যবহার করলেন।
মাহাবুব কবির : যে কথা তিনি বলেন, তা যে সব সময়ই নতুন এমন নয়। কিন্তু আমাদের অতিচেনা পুরনো বিষয় আর কথাকে তিনি এমন তালে এমন ভঙ্গিতে বাজিয়ে নেন, যাতে তা নতুন কালের নতুন কথা হয়ে ওঠে। যেমন:
এই পাখি বার্তাবহ
শীতের
আর শীত পৃথিবীর ছোট বোন
(দূত)
বলা বাহুল্য মাহবুব কবিরের এই আধুনিকতা একালের অন্যসব কবিদের তুলনায় ‘সুন্দরের তৃষ্ণা’-কে জাগিয়ে রাখার এক নন্দনতাত্ত্বিক বন্দনা।
বাংলা কবিতায় আধুনিকতা যে মর্জি নিয়ে উপস্থিত, তা কোথাও মৌল প্রশ্নের আকার নিয়েছে। যেমন সময় নিয়ে আধুনিক কবির ভাবনা। সময় কেন সময়হীন এই ভাবনা বর্তমান সময়ের। জীবনানন্দ দাশ যে সময়বোধে আক্রান্ত হয়েছেন, তা হয়তো পাশ্চাত্য বিজ্ঞান-বুদ্ধি ও কবিচেতনায় আছে, কিন্তু বাংলা কবিতায় নেই। এক্ষেত্রে মাহবুব কবির এই সময়হীন সময়কে উপস্থাপন করেছেন অতি সহজ সরল শব্দানুষঙ্গে। দৃষ্টান্ত:
বাহ পৃথিবীটা দেখছি একেবারে নবীনা
এর নদীতে ডুব দেয়া ভালো
এ রকম সচ্ছল নদীর ছলাচ্ছলে
মনপবনের নাও ভাসিয়ে দেয়া মন্দ নয়।
বাইসন ম্যামথের পেছনে ছুটতে ছুটতে
একদিন এ রকম একটি পৃথিবীর সঙ্গে
দেখা হয়েছিল,
তার কথা মনে পড়ে।
আমি প্রতিদিন নতুন নতুন পৃথিবীর
সাক্ষাৎ পেতে ভালবাসি
যে প্রতিদিন অষ্টাদশী রমনী, প্রতিদিন
বিবাহ-বার্ষিকী, প্রতিদিন দাঁত ব্রাশ করা।
পৃথিবী রজঃস্বলা চিরকাল,
আমি এর সাথে খেলা করবো এখন। (পৃথিবী)
অন্তহীন সময়ের দিকে তাকিয়ে মাহবুব যেন নতুন জন্ম নেয়া শিশু। এক অনন্য শিহরণ তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। যেখানে বহু সময়ের পলেস্তরা ভেঙে নতুন নতুন পৃথিবীর জন্ম হয় অবিশ্রান্ত সময় সেখানে কবির খ-িত অস্তিত্বের অনুভবকে অনিবার্যভাবেই টেনে আনে আত্ম অহং-চৈতন্যে। পৃথিবীর সঙ্গে খেলায় সে মত্ত হয়। এই কি শেষ কথা? তাও নয়। তাই তিনি লেখেন:
সমুদ্রের সবচেয়ে ছোট মেয়ে এই হাওড়।
আষাঢ়ে ভাসা জল আর হুহু
ভাটি হাওয়ার বুক অবধি ডুবে আছি।
শরীর জুড়ে প্রাগৈতিহাসিক গন্ধ।
গুপ্ত-স্রোত রহস্য করে বলে, জলের পাহারদার।
(হিজলজন্ম)
ঈশান জয়দ্রথ : আমরা জানি এলিয়টের কবিতা প্রধানত সংগীতধর্মী। নানা রকম কাব্যিক ও অকাব্যিক শব্দের দ্বারা তিনি বিভিন্ন আলোকপাত করে তার আবেগ বা সংবেদন প্রকাশ করেন। তাছাড়া ঐতিহ্য আর মৃত্যুর সুরও তার কবিতার অন্য দুটি বৈশিষ্ট্য। তার পা-িত্যের কঠিন স্পর্শেও তার কবিতা ভীষণ দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে এবং আমাদের মতো সহৃদয় পাঠকও সেখানে প্রচ- আঘাত খেয়ে টলতে টলতে ফিরে আসেন। ঞযব ধিংঃব ষধহফ-এর মধ্যে এলিয়টের এই গুণগুলোর সুন্দর কাব্যিক সমন্বয় দেখা যায়। এলিয়টের কবিতার এই গুণগুলোর উল্লেখ করা হল এই জন্য যে, নব্বই দশকের আরেক কবি ঈশান জয়দ্রুথ, তার কবিতায় ঐতিহ্যের অনুবর্তন আর সংগীতধর্মীতা লক্ষ করা যায়। উদাহরণ:
শিকারী হাওয়া অশান্ত ঢেউয়ে ফুসেঁ ওঠে
হাওয়া সে দূরন্ত বাজ, ঢেউ নয় তস্ত হাঁসগুলো
শিলাবৃষ্টির নখে বন্দী ছিল হাওয়া
আর ম্লান থামের আদরে শান্ত ও নিদ্রিত হবে ঢেউ
নিদ্রিত ঢেউয়ের নিচে শান্ত তোমার কুটির
শিলাবৃষ্টি হয়ে আমার ঝরে পড়া
কে আমাকে নিয়ে যাবে নিরক্ষীয় বনে?
আমারও যে রাত্রিবাস ভিজেছে গোপনে
মাঠময় দাপিয়ে বেড়ায় হাওয়া শুধু হাওয়া
ঘাসে ঘাসে উল্লসিত কারা ঢলে ভেসে যাওয়া
মর্মর পিতৃমূর্তি, নিখোঁজ শোনে
বর্ষায় আমার মৃত্যু নেই
আমার মৃত্যু নিখোঁজ হয়ে আছে
লাল মোরগের আরো লাল ঝুঁটি দেশে।
(শ্রাবণ)
আহমেদ নকীব : আমাদের কোনো হারানোই নিঃশেষ ঋণাত্মক নয়। জীবনের হাওয়া প্রসারিত হয়ে সেই শূন্যকে পূর্ণ করে, যা অপূরণীয় মনে হয়। হয়তো তার ক্ষতিপূরণ অন্যভাবে জীবনের কাছেই মেলে, প্রকৃতির শুশ্রƒষায় সেই হারানো বোধ নতুন আনন্দিত বোধে আশ্বস্ত হয়। কিন্তু এর বিপরীত বোধেও বিপন্ন হই আবার যখন এমনকি নিসর্গও নিরন্তর শূন্যতার চিত্রকল্পে মনের কাছে উপস্থিত। অর্থাৎ একই অভিজ্ঞতার বিনিময়ে কখনো মুগ্ধ প্রসন্নতার প্রসাদ, আবার কখনোবা নিঃস্ব, নিরবলম্ব বেদনার সঙ্গে পরিচয়। অনুভূতির এই বর্ণ পরিবর্তনই আহমেদ নকীব এর কবিতার আবেগসূত্র। আহমেদ নকীবের কবিতায় চিত্রকল্প ও সংগীত সার্থক সহযোগী হয়ে ওঠে। দৃষ্টান্ত:
অন্ধ বিড়াল কেঁদে ওঠে একা পৃথিবীর কোলাহলে,
শিশুর ছায়ার অধীনে ছিলে কী?
প্রশ্নের ফণা দোলে!
সর্ব বুড়োটি হেসে কহে শোনো
আমিষ ভাতে মাথা রেখে গোণো,
আছে কি সাজানো সকল খ-,
ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে কেবলি, মার্জার মহাভ-!
অথচ তুমি শিশু ছিলে যে আলা ভালা,
পারলে দাও তারে সজোরে কানমলা?
সেই শিশু আজ ফোকলা বুড়ো দাঁত,
একই দেহ ঘরে বেঁধেছে সংঘাত?
হঠাৎ সেদিন ব্যর্থ বিড়াল উড়াল দিয়েছে রাতে,
উঠেছে শূন্যে, ব্যাপক শূন্যে, ছায়া পথ থেকে চাঁদে।
যখনি মামণি শিশুটিরে তার গান দিয়ে ভালোবাসে,
হয়তো সেজন অলক্ষে ফের, গুটিগুটি ফিরে আসে।
(আর তোমরা যাকে বলো শুধু গোফে কালিমাখা চোর)
দৈনন্দিন জীবনের নানা তুচ্ছতাও কবিতার বিষয় হতে পারে। কেবল ‘অনন্ত, অমধ্য, অভেদ্য’ ইত্যাদি নিয়ে কাব্য রচনা চলতে পারে না। আহমেদ নকীব উত্তরাধুনিক চিন্তা নিয়ে দৈনন্দিন জীবন আর ব্যবহারিক প্রয়োজনকে কবিতায় তুলে আনেন। অবশ্য তার কবিতায় দৈনন্দিতার ব্যবহার কেবল তুচ্ছবিষয় নিয়ে নয় সেখানে সভ্য মানুষকে ব্যঙ্গ করার প্রক্রিয়াটিও দুর্লক্ষণীয় নয়। ক্লাসিক-রীতির যাবতীয় ব্যবহৃত শব্দ আর চিন্তা থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে নকীব রোমান্টিকদের কল্পনার বিরুদ্ধে কটাক্ষ করেন। আঙ্গিকের দিক দিয়েও তিনি কবিতাকে ঢেলে সাজাতে চান। ‘আলম, লোকাল সুরা, ইপিআই ও ডিফেন্স’ তার কবিতায় স্থান পায়। তার শব্দ ও উপমার অভিনবত্ব পাঠককে আরো চমকিত করে। তিনি object-এর উপর তেমন গুরুত্ব দেন না; বরং সাধারণের জীবনের অভিব্যক্তি রূপায়ণে শিল্পিত প্রকাশের উপরই গুরুত্ব দিয়েছেন।:
আয়শা ঝর্না -র কবিতার প্রকারণগত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কবিতায় স্বচ্ছ চিত্র তৈরি করার দক্ষতা। তার কাব্য রচনার মধ্যে এমন একটি আপাত সারল্য, প্রয়াসহীন প্রসাদগুণ আছেযা বিস্ময়কর। কিন্তু একটু বিশ্লেষণ করলেই ধরা পড়ে তার কাব্য নির্মাণ-কৌশলে রয়েছে ইমপ্রেশনিস্ট ধর্মের প্রাবল্য। এটাও হয়তো তার কাব্য-দার্শনিকতার একটি সূত্র। এখানে একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হচ্ছে ইমপ্রেশনিস্টদের দার্শনিক-ভিত্তির সঙ্গে আয়শা ঝর্নার এই মিল থাকলেও বাংলা কবিতায় তিরিশি পা-বদের মধ্যে অমিয় চক্রবর্তীর কবিতাতেও সেই নন্দনতাত্ত্বিক শৈলীটি লক্ষণীয়। তবে আয়শার সঙ্গে অমিয় কিংবা ইমপ্রেশনিস্টদের পার্থক্য হচ্ছে ইমপ্রেশনিস্টরা যেমন সৌডল রেখা আকতেন না; অমিয় চক্রবর্তীও তেমন পুরো বাক্য রচনা করেন নি কিন্তু আয়শা মোটামুটি পুরো বাক্য রচনাতেই তার সৌন্দয়বৃত্তিকে পরিস্ফুট করেছেন। দৃষ্টান্ত:
পথে যেতে যেতে হাঁস মৃত বেড়াল
গৃহীর কুলা থেকে চাল ওড়ে
অতিকায় স্বপ্নে বিকট দৃশ্যে মরে যাই আমি
অন্ধকারের বুক মোছাতে হৃদপিন্ড কাঁপে।
(ডাইনোসর)
চঞ্চল আশরাফ : নাগরিক কবি। তার কবিতায় আধুনিক-মনস্কতা নাগরিক জীবনবোধের গভীর থেকে উঠে আসে। সেই সঙ্গে তার কবিতায় প্রকৃতি, আমাদের লোকায়ত জীবন ও সংস্কৃতি তার মননদীপ্ত চেতনা ও আধুনিক-মনস্কতার সমন্বয়ে উঠে আসে। এই সমন্বয় সাধনই তার কবিতার বৈশিষ্ট্য। তার শব্দ-গ্রন্থনা বাক্যের মধ্যে ভিন্ন একটি আবেগের প্রলেপন তৈরি করে। দৃষ্টান্ত:
আমি আলো ঢেলেছিলাম আলো।
তুমি কালো নদী থেকে উঠে এসে জাপটে ধরো আমাকে
সূর্য বেরিয়ে পড়ে মেঘ থেকে, কতোকাল সে আমার
বন্ধু ছিলো না
ধুলোর ভেতর দিয়ে জুতোহীন হেঁটে গেছি পাতায়-বাকলে
গুপ্তাঙ্গ ঢেকে
দুপুর সকাল থেকে, সন্ধ্যা, বিকেল থেকে;
রাত্রি বসেছে বেঁকে ভোরে
আমি আলো ঢেলেছিলাম, আলো।
(ভারতবর্ষ)
এই যে আবেগ মথিত শব্দ উৎসারণ; এটা শুধু আবেগ নয়, সেখানে একটি দার্শনিক মীমাংসাও আছে; আছে ইতিহাসবোধের সঞ্জীবনী-সার। এই যে ‘কতোকাল সে আমার বন্ধু ছিলো না’ এই পঙক্তি কতো আবেগগ্রস্ত অথচ দার্শনিকতায় পূর্ণ। যখন সে বলে ‘সূর্য বেরিয়ে পড়ে মেধ থেকে’, আর এই সূর্যকে যখন সে বলে ‘কতোকাল সে আমার বন্ধু ছিলো না।’এটা বিশ্বের সঙ্গে ভারতবর্ষকে একটি ঐক্যের সূত্রে গ্রথিত করার ইতিহাস চেতনা নয় কি? চঞ্চলের কবিতায় ‘বাক্যের পর বাক্য’ নিরাশার শব্দ-যোজনা থাকলেও সামগ্রিক বিচারেএকটি সম্পূর্ণ কবিতার ভাব-অর্থের দিকে কে আশাবাদী, শেষ পর্যন্ত আশায় বুক বাঁধারই স্বপ্ন দেখেন চঞ্চল আশরাফ।
মুজিব ইরম : মনসামঙ্গল কাব্যের কবিদের শিল্পবোধ কাব্যের বাহ্য আকারে ধরা পড়েছে কবি মুজিব ইরম -এর কবিতায়। মুজিব স্বেচ্ছায় এই ফর্মটিকে তিনি বেছে নিয়েছেন। তার কবিতার বয়ান-রীতিটি মধ্যযুগীয় হলেও, সে বর্তমান মানস-সংগঠনের ব্যক্তি বলে টেনশন পীড়িত সভ্যতার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় তার কবিতার শরীরে। প্রচুর আঞ্চলিক শব্দ দিয়ে তার কবিতার শরীর গড়ে ওঠে। তবে মুজিবের কবিতার সার্থক দিকটি হচ্ছে, তার কবিতায় প্রসঙ্গ চ্যুতি নেই, অনাবশ্যক বিষয় নেই; আছে বর্তমান প্রসঙ্গকে লোকায়ত ধারায় উন্মোচিত করার বিশেষ প্যাটার্ন। দৃষ্টান্ত:
পাশের বাড়ির মেয়ে চোখ দিল জন্মের পর। সেই থেকে প্রতি ভোরে মা খাওয়াতেন নজরের পানি। অসংখ্য সুরায় ভরে দিতেন গলায় ঝোলানো কালো সুতো তাগা। লাল মোরগটা নিয়ে যেতো বৃদ্ধ ফকির। তার সাথে বদচোখের বিষ।
এখনও নজর এড়াতে মা আমার পাঠ করেন সমস্ত বিশ্বাস। নিয়ে আসেন নুন পড়া,পানি পড়া, কুমারের ঘর।
আমি কি শিশু মাগো নজরে দেইনি মুখ স্তনের বোঁটায়? ক্যানো তবে এই ভয়?আমাকে দিয়েছে সে তো অন্য নজর; যে নজরে হরদম হৃদয় পোড়ায়।
(নজর)
মুজিব ইরমের কবিতায় লোকজ উপাদান উঠে এসেছে অত্যন্ত আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। তার কবিতার প্রাকৃতিক পরিবেশটি হচ্ছে গ্রামীণ কিন্তু মানুষগুলোর মানসিকতা হচ্ছে আধুনিক। কবিতায় যে উত্তম-পুরুষ চরিত্রটি পাওয়া যায়, সে চরিত্রটি খুবই মননশীল ব্যক্তি। যাকে মধ্যযুগীয় চরিত্র দিয়ে বিশ্লেষণ করা যাবে না। তার প্রতিটি কবিতায় গল্পের বীজ রয়েছে। সেখানে চরিত্র, চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত উপস্থিত। তাছাড়া মুজিবের গদ্যফর্মের কবিতায় মাঝে মাঝে অসাধারণ মননদীপ্ত বাক্য ও ভাবনা উঠে আসে।
কবির হুমায়ূন: কবির ব্যক্তিমানস একদিকে যেমন দুর্গম পথসন্ধানী, অন্যদিকে তেমনি সভ্যতার সুস্থ বিবর্তনে বিশ্বাসী। জীবনানন্দের নিঃসঙ্গতাবোধ কিংবা সুধীন্দ্রনাথের নাস্তিকতাবাদ তার কবিতায় কখনো কখনো ছায়া ফেলেছে বলে মনে হয়। আবার মাঝে মাঝে অমিয় চক্রবর্তীর শুভবুদ্ধিসম্পন্ন হার্দ্য সুরের অনুরণনও তার পৌরুষযুক্ত উচ্চারণে লক্ষ্য করা যায়। তার কাব্যগ্রন্থ্য ‘হাতের আঙুলে খেলা করে পাঁচ পৃথিবীর রোদ’-এর কোনো কোনো কবিতায় প্রেমের আকাক্সক্ষার স্পষ্টতা দেখা যায়:
নির্মেদ অপেক্ষা দুপুর রোদের নৃত্যে খেলে
হৃদকম্পনের তাপে। এ কার অপেক্ষা চলে
পানপাতা চোখে! ও ভুল ভালোবাসা
তোমার রাত এখন কেমন থাকে...!
(ভুলকা-)
এই কবিতায় বিরহ, ভালোবাসা ও সৌন্দর্যবোধ সমকালীন চেতনা নিয়ে উপস্থিত। একথাও মনে রাখতে হবে কবির হুমায়ূনের পঙ্ক্তি-বিন্যাস পঞ্চাশ দশকের কবিতার কণ্ঠ থেকে আলাদা নয়। অনেক ক্ষেত্রে তার কবিতার থিমও পঞ্চাশের মতোই। তাহলে কবিরের স্বাতন্ত্র্য কোথায়? হ্যা, তিনি যেন চান কবিতাকে ব্যবহারিক জীবনের খুব কাছে নিয়ে আসতে। একদম ব্যক্তিগত অনুভবে কবিতাকে গড়ে তুলতে পারলেই কবিতা শিল্পপ্রসাদে শুদ্ধ হয়ে উঠবে, সে চেষ্টাই তার কবিতার কণ্ঠে বেজে ওঠে:
হিরার টিকিলি তোমাকে আদরে ছায়া দেয়, তুমি
তার সবটুকু নিয়ে যাও ঘরে। বাইরে এখন সুচতুর
বিচক্ষণ গোয়ালা দুধের লোভে চোখবাজি মারে, কার
সুখে তবে আমি যাবো দিতে এই রোদে পোড়া ভূমি।
(বিবিধ কবিতা)
মাসুদার রহমান : নব্বই দশকের কবিতায় আবির্ভূত হন সেই দশকের শেষ পাদে এসে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হাটের কবিতা’ প্রকাশিত হয়েছে ২০১১ সালে। কবিতায় সরল বাক্য নির্মাণের মধ্য দিয়ে অসাধারণ চিত্রকল্প নির্মাণে দক্ষ এই কবি। তার প্রতিটি কবিতায় জীবনবোধের খ- খ- গল্প উঠে আসে।
গল্পে জাদুবাস্তবতার প্রসঙ্গ নিয়ে আমরা মেতে উঠি। আমাদের গল্পে কীভাবে জাদুবাস্তবতা কাজ করেছে সে প্রসঙ্গ এখন আলোচনার বিষয়। মাসুদার রহমানের কবিতায় সে-জাদুবাস্তবতা সরলমাত্রা থেকে গভীর বোধের প্রান্তরে নিয়ে যায় সে আমরা কী তা খেয়াল করি? যখন তিনি লেখেন:
ধানখেতের ওইপারে আর কোন বাড়ি নেই
কেবল আমার বাড়ি। আমাদের বাড়ি
পাতা কুড়োনির মেয়ে সন্ধেবেলা
বিস্ময়ের ডালিয়া ফুল পুঁতে এলে গোধুলির পাড়ে
জোনাকি ও তারার পোষাকে রাত্রি আসবে
এবং পরের সকালে
দিনের গজানো ডালপালা
মেলে দেবে আকাশে আকাশ
ধানখেতের এপারের বাড়ি
তার কোন আত্মীয় থাকে না!
(কবি)
কবিতার এ মেজাজ, বর্ণনা আর কবির উপলব্ধি জাদুবস্তবতার খেলা ছাড়া আর কিছু না।
মাসুদার রহমান এমনি করে ছোট ছোট বাক্যে দৃশ্যের এক অভূতপূর্ব মন্তাজ তৈরি করে পাঠকের বোধিসত্তায় কাব্যপাঠের তৃষ্ণা তৈরি করেন। চিরচেনা দৃশ্য আর অভিজ্ঞতার উপলব্ধিকে পাঠকের কাছে সঞ্চার করে দিতে দক্ষ হয়ে উঠেছেন তিনি। মায়া, রহস্য আর দৃশ্যের অপরূপ চিত্রণে তার কবিতা একটি নতুন প্যারাডাইম নির্মাণ করেছে আমাদের বাংলা কবিতায়।
শোয়াইব জিবরান : শোয়াইব জিবরানের কবিতা পাঠ করলেই বোঝা যায়, সেগুলো সযত্নে নির্মিত। এমন নির্মাণের কারুকৃতির পেছনে সুপ্রচুর কবিতাচিন্তার বিবর্তন আর শ্রমশীলতার প্রচ্ছায়া যথেষ্টই স্বচ্ছ। তিনি কবিতার আবেগ আর মিথচেতনায় ঋদ্ধ এক দক্ষ কারুকার; যার আঙুল থেকে জেগে ওঠে হার্দিক সৌন্দর্য, আটপৌরে শব্দ সমষ্টি হঠাৎ নতুন অর্থদ্যোতনা পেয়ে যায়। তাথাকথিত সমাজসচেতনতা নেই শোয়াইব জিবরানের কবিতায়, কিন্তু সমাজসংলগ্নতা আছে। ব্যক্তি-অস্তিবোধের চেতনাকে তিনি পাঠক চৈতন্যে স্পর্শ দেন অচেনা সিম্ফনির মতো। তার অনুভূতি উপলব্ধি করা যায়, মর্মমূলে অনুভূত হয়, মিথ থাকে খুবই প্রচ্ছন্ন অন্তর্মুখী হয়ে, কিন্তু তার কবিতার সবটাই খুলে খুলে দেখা যায় না। এক প্রচ্ছন্নতার কুহকনগরী তার কবিতা। দৃষ্টান্ত:
রাত্রি ছিলে। রাস্তায় একা পেয়ে শুনিয়েছ গান, মানে বুঝিনি। আজ অন্ধকারে ভয়ে ভয়ে তুলে ধরেছি মাথা, ঐ যে আকাশ নুলো ভাই আর তারা সাত জন, বোনের লাশ নিয়ে শ্মশানেতে যায় নিত্যরাতে, কি বেদনা তাদের সাথে খেলা করে, জানি।
...ছায়া ফেলে হাঁটি। তিনি স্নেহ আর শৈশব। তার সাথে জানাশুনা ছিল সেকালে, আজ শুধু
মাছির মতো মুখ মনে পড়ে। রাত্রি ছিলে।
(ছায়া এলিজি)
সরকার আমিন : প্রজ্ঞাবান কবি। নব্বই দশকের অন্যতম ছোট কাগজ ‘মঙ্গলসন্ধ্যা’র পুরোধা সংগঠক। তিনি তার কবিতায় ধর্ম-দর্শন প্রচারে বিশ্বাসী। আর এই জন্যেই তিনি বিজ্ঞানের এই সময়ে খুব ইন্টারেস্টিং কবি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছেন। তবে তার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য আবেগ ও যুক্তির সমন্বয়। আর এই সমন্বয় সাধনে তিনি নিপুণভাবে ধর্মতত্ত্বের প্রয়োগ করেন। সেই সঙ্গে মিথ ও লৌকিক জনশ্রুতিকে কবিতায় সার্থকভাবে উপস্থাপন করেছেন তার কবিতায়। তার তত্ত্বদর্শনে ব্যক্তির অস্তিত্ব প্রাঞ্জল; ব্যক্তির চেতনস্পর্ধার জন্যে তিনি উচ্চারণ করেন:
আমার পীর এ সাদা হাঁসটা
মনের আনন্দে যে স্নান করছে পূর্ণ দীঘিতে
এখন আমি পীরের নামে আমার প্রাণ জলে ভাসাবো।
দুপুরের উজ্জ্বল রোদগুলো আমার পীর ভাই
যে মুছে দেয় অন্তরের জ্বর
আমার পীর কালো মানুষ। তার আলো স্পর্শে
অসুখ পালায়।
(পীর)
Subjective-ধারণাবাদী কবি সরকার আমিন। তিনি ‘তারই চেতনায়’ দেখেন ‘সাদা হাঁসটা’ তার ‘পীর’। এই যে তার কবিতার শব্দচৈতন্য এই চৈতন্য শুধু ব্রহ্মোপলব্ধির ব্যাপকতর শুভ্রতায় সাগরফেন নয়, এই চিত্রে সঙ্গীতে অলৌকিক জাদু-স্পর্শে অভিজ্ঞ ইন্দ্রিয়ের বিচিত্র প্রবাহ স্রোত লক্ষণীয়।
শাহনাজ মুন্নী : প্রচলিত অর্থে আধ্যাত্মিক নয়, কিন্তু অন্তর্মুখীন ও অনুভূতি প্রধান হবার ফলে বাস্তব স্পর্শের অতীত, যেন এক অধিদৈব-প্রদোষালোক আচ্ছন্ন করেছে শাহনাজ মুন্নী-কে। আর তাই তিনি তার কবিতায় প্রকাশ করেন মরমীচেতনা। মরমীতাই শাহনাজ মুন্নীর কবিতায় ঘনিয়ে তোলে অপরিচিত সান্দ্রতা-রহস্য-কুয়াশার স্তর এবং সেই কুয়াশা ছিঁড়ে ছিঁড়ে দেখার উপলব্ধি নিয়ে তিনি বিনির্মাণ করেন তার কবিতার প্রতিটি শব্দ। সঙ্গত কারণেই তার কবিতায় উঠে আসে বেদনা, ক্ষোভ আর সংক্ষুব্ধ চেতনা। দৃষ্টান্ত:
মানুষেরে চিনো নাই
মানুষই বাঁচায় সব মানুষই মারে
একবার যদি পারে টলটলে তালশাঁস
ধানবীজ, আলপথ, নিষ্পাপ বাছুরের গলা জড়াবারে
তিনগুণ ছুটে আসে প্রাণ
(...)
অনন্তর এই ফুল বহুরঙা বীজের জনক
(ক্ষমঃ গো শ্বেতদুগ্ধ)
টোকন ঠাকুর : আধুনিক কবিদের বড়ো ঘাটতি, প্রকৃতির এই ভূমিকা তাদের কবিতায় অনুপস্থিত। তাদের কাব্যে পাহাড়, অরণ্য, সমুদ্র, নদী, ঋতু সবই বিচ্ছিন্ন প্রতীক, চিত্রকল্পে পর্যবসিত। প্রকৃতির দৃশ্যাবলী যেন সযতেœ রাখা রমনীয় দৃশ্যাবলীর একটি এ্যালবাম মাত্র। হয়তো বিচ্ছিন্নতাবোধে পীড়িত নাগরিক কবিদের ক্ষেত্রে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কবি টোকন ঠাকুর ব্যতিক্রম।
কৈশোরিক এই কুয়ো... ভিতরে প্রতিছায়া ছোবল
আর আমি জর্জরিত মধ্যযাত্রা ভেঙ্গে দাঁড়িয়েছি
এই ভুলে চন্দনের গন্ধে ... আহা রেশমী কল্লোল
ছুঁয়ে ঝরে বেল ফুল... আমি তবু বিভীষায় গেছি
(দ্বিজ জীবনের পদাবলী)
একালের বিচ্ছিন্ন, অতি নিঃসঙ্গ করাল জীবনের দ্বন্দ্বেও প্রকৃতির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছেন টোকন ঠাকুর। দেশ ও কালের পরিসীমায় একটি জীবন গুটিকয় বছরের যোগফল নয়, যেন অনন্ত কালের ফলশ্রুতি। একটি কালে তাই অনন্ত কালের আভাস আসে তার কবিতায়। প্রকৃতি এখানে শুধু রূপক কিংবা উপমা নয় এটি মানুষের অস্তিত্বের একটি মৌল অংশ। তাই প্রকৃতি ও মানুষ টোকনের চোখে অভেদ সিদ্ধ। টোকন লেখেন:
জলের দিকেই যাই আর অনুস্মৃতি করি এই
বিন্দু বিন্দু বুদ্বুদ্
মেঘের সন্তান আমি অগোচরে জলদাস
ডাঙায় বসতি?
(...)
জলের দিকেই যাই আর অনুস্মৃতি করি এই বিন্দু বিন্দু বুদ্বুদ্. . .
বলো মেঘ উড়ে যাওয়া নদী
কতোদূর সমুদ্দুর
অপেক্ষায় থাকে?
(জলদাস)
শাহেদ শাফায়েত : আধুনিক বাংলাদেশের কবিতায় যদি কিছু অর্জন ঘটে থাকে তবে তার অন্যতম উৎস রূপে কাজ করেছে পূর্ব-স্মৃতির উজ্জ্বল-সঞ্চয়। তারই অন্য নাম ঐতিহ্য। ছোট ছোট আঘাত লেগে যখন জীবনের সমস্ত বৃত্ত ভেঙ্গে যায়, তখন নিঃসঙ্গ অস্তিত্বের ভেতর থেকে বিচ্ছিন্নতার অনুভব বেরিয়ে আসে বটে, তবু তার ভেতর বেঁচে থাকার বিশ্বাস থাকে, থাকে স্মৃতির উজ্জ্বল সঞ্চয়, ঐতিহ্যকে লালনের প্রচেষ্টা। এই ধারার কবি শাহেদ শাফায়েত। স্মৃতির উজ্জ্বল সঞ্চয় নিয়ে ঐতিহ্যকে লালনের প্রচেষ্টায় নিবেদিত এই কবি।
আমাদের জন্মগুলি লোমশব্দে ঢাকা
দূরের বন্দরে; জাহাজ ডুবির মতোই ঘটে যায়
যার সমাপ্তি নেই সমুদ্র তরঙ্গের ভেতর
এক একটি শঙ্খের আত্মায় এক একটি সূর্যপতনের কথা।
(আয়না)
মিথ বা ঐতিহ্যের প্রয়োগ ছাড়া কোনো কালেই, কোনো দেশেই নতুন কবিতার ঋদ্ধি ও বিস্তার হয় নি। নব্বই দশকের কবিতায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটে নি; তার স্বাক্ষর পাওয়া যায় শাহেদ শাফায়েতের কবিতায়। শাহেদ শাফায়েত প্রধানত মিথকে তার কবিতায় ব্যবহার করেছেন কোনো নবীন আইডিয়ার দীপ্তমান প্রতীক রূপে, অতীত জীবনের সঙ্গে বর্তমান জীবনের যোগাযোগের সূত্র-স্মৃতির উচ্চারণ হিসাবে।
কামরুজ্জামান কামু : ইমেজের সবচেয়ে সহজ ও সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা হচ্ছে ওটা আর কিছু নয় শব্দচিত্র মাত্র‘a picture made out of words প্রত্যেক ভাষার শব্দাবলীরই এই সহজাত চিত্রধর্ম এবং সেই চিত্রধর্মের নিপুণ প্রয়োগ করে কবিরা কবিতার মধ্যে ছবি ফুটিয়ে থাকেন। বাংলাদেশের আধুনিক কবিদের অক্লান্ত চর্চায় তাদের কবিতার মধ্যে অফুরন্ত চিত্রসজ্জা দেখতে পাওয়া যায়। এই চিত্রসজ্জা হয়ে উঠেছে বাংলা কবিতার এক প্রাণবন্ত বৈশিষ্ট্য। এমনই সুষ্ঠু ইমেজ প্রয়োগকারী এক শুদ্ধতম কবি কামরুজ্জামান কামু ।
আমাদের হাওয়া গিয়ে তোমাদের জামপাতা মৃদু ভাবে নাড়ে,
ফলে কি জামের বন আত্মীয়প্রবণ হয়ে ওঠে!
আমরা কোকিল ছাড়ি তোমার কাকের গৃহে ডিম পেড়ে আসে,
তোমাদের পক্ষীছানাগুলি এ পাড়ের ডালে বসে বিষ্ঠা ত্যাগ করে।
সীমান্তরক্ষীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পিপিলিকা শ্রেণী
খাদ্যবহন ক’রে নিয়ে আসে এ পাড়ের থানায় থানায়।
একই জলে স্নান করে দুই ভূগোলের দুটি লো
বিদেশ এতটা নিকটে থাকে! এতখানি শিলাময়!
(সীমান্ত)
কামুর আরো কিছু কবিতা আছে, যেগুলোতে চিত্রগুলি ঠিক আর চিত্র হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছে আরও কিছু, যাকে বলা যায় চিত্রমায়া। নব্বইয়ের কবিতার ক্ষেত্রে কামরুজ্জামান কামু কর্তৃক এই চিত্রমায়া তৈরির প্রক্রিয়াটি একটি অভিনব সংযোজন।
আমরা কিন্তু পাখি বেচি। মা ঠাকরুণ দয়া করবেন, আমরা কিন্তু এক পয়সাও বেশি নিচ্ছি না, এবারের শীতে যেন খুব পাখি হয়। এই ব্যবসায় আমাদের পিতৃপুরুষের গুণাগুণ আছে। কাজেই আমরা মেয়েদের কথায় কান দিই না। তারা তো ব্যবসার কী বোঝে? আর আমরা তো খালি বিদ্যাসাগরের কথাই দেখি ফলে। ফলে আমরা পুরুষদের কথা ঘূর্ণ অক্ষরে শুনে থাকি। ঠাকরুণ আপনি কী ভাব করি অক্ষর ঘুরান মা। আর যে কবিদেরকে দেখা যায়, তারা নাকি এ সকল ভাব বড় বুঝি না, খালি গেরো, খালি বয়স বেড়ে যায়। আর আমাদের অনেকগুলো শীতকাল পাখিহীন থেকে যায়। ফলে আমরা ঘূর্ণ পাখি ঘূর্ণ তীর বহু ঘূর্ণ পথ এইসব ধীরে ধীরে ভাবনা চিন্তা করি। আর আমাদের গবেষণাগুলিও দেখুন কতো কতো রৌপ্যমুদ্রা, তমসামুদ্রা, ইতর মুদ্রায় বিক্রি হয়ে যায়।
(পাখি বিক্রেতা)
শিবলী মোকতাদির : আধুনিক বাংলা কবিতায় দুরূহতা এসেছে কবিতার দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলের জন্য। যে-কবিতা উষ্ণ আবেগের কাছে সহজে আত্ম-উন্মোচন করে, যার লক্ষ্য উপভোগ, রসস্বাদ বিতরণ, আধুনিক কবি তা মেনে নিতে বাধ্য নয়। তাই একালের কবিকর্ম ততটা হৃদয়-উৎস খুলে দেয় না, যতটা বুদ্ধির মুক্তি ঘটায়। রসস্ফূর্তি নয়, দ্যুতিময় সত্যের প্রজ্জ্বলনই আধুনিকতার একটি মূলসুত্র। আধুনিক কবির বাকশিল্প তার সমস্ত ব্যাপ্তি ও জটিলতা নিয়ে শুদ্ধ মনীষা ও অনুসন্ধিৎসার শ্রমের কাছে বিশেষভাবে আত্মসমর্পণ করে। আধুনিক কাব্যের এই নতুন লক্ষ্যে মননের ভূমিকা প্রধান বলে আয়াসসাধ্য বিদ্যাকূটত্ব ও কঠিন শিল্পবুদ্ধি তার মধ্যে প্রবেশের পথ করে নিতে পেরেছে। এইভাবে অংশত অবস্থার চাপে ও মুখ্যত হাল ফ্যাশনের মনন দুরস্ত শিল্পসৃষ্টির সূত্রে দুরূহতা ও সম্প্রসারণীয়তার সমস্যা নব্বইদশকের কবিতাতেও এসেছে। এই ধারার একজন কবি শিবলী মোকতাদির। তার কবিতা পাঠককে এমন একটা টেনশনের মধ্যে নিয়ে যায় এবং এমন একটা সম্প্রসারণীয়তার সমস্যার মুখোমুখি করে দেয় যে, পাঠক বুক ভরে নিঃশ্বাস টানবার অবকাশ পায় না।
সেদিন প্রথম বিজলী। আমি চমকে উঠতো। তারাও উঠতাম
ঘরে ঘরে মন্ত্র এলো, যেন বা দুর্বাঘাস।তারাই হাসত
আমি তৃণ ভেবে।
আমি এই খেলা যদি না শেখাই। শিখি। ডুমুর বলে...
কেন? প-িত হলে। তার চশমা হলে।
(আজি ঋতু বদলের দিনে)
জাফর আহমদ রাশেদ : কবিতার বৈচিত্র্য ও বিস্তারের কথা মনে রেখেও স্বীকার করতে হয় তার কবিতা মূলত অন্তর্মুখী। রাজনৈতিক আন্দোলনে কখনো উত্তেজনাবোধ করলেও বা সামাজিক অন্যায় ও মিথ্যাচার তাকে পীড়িত করলেও কবিতা লেখার সময় বাইরের জগতের উত্তেজনা ও কলরব তিনি পরিহার করতে চান। তাই তার কবিতা হয়ে ওঠে সুররিয়ালিস্ট ধারার।
আকাশে কেবল অশ্বের আনাগোনা;
পুরোনো দেয়াল আকাশে নিয়েছে ঠাঁই
হাওয়ায় হাওয়ায় কত কথা যায় শোনা,
চোখ ফেরালেই হয়ে যাই আনমনা।
আকাশে ঘোড়ারা ছুটে চলে খুব দ্রুত
এধার-ওধার উড্ডয়নের ফণা
এ রকম গতি পায়নি তো দেবদুতও
ঘোড়ারা কি আজ হয়ে গেছে আপ্লুত?
[...]
(আকাশের ঘোড়া)
তবে একথা খেয়াল রাখতে হবে প্রথাপ্রিয় কবি জাফর আহমদ রাশেদের কবিতায় সুররিয়ালিজম যেভাবে ব্যবহৃত হয়, তা জীবনানন্দকে অতিক্রম করে নয়। তা ছাড়া জাফর আহমদ রাশেদ সচেতন প্রথাপ্রিয় হলেও মাঝেমাঝে স্বল্পভাষ্য ব্যঞ্জনাময় প্রকাশ-শৈলী দিয়ে কবিতা রচনা করেন যা সমকালীন টেনশনপীড়িত আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটকেও উপস্থিত করে।
অলকা নন্দিতা : কবিতা বক্তব্য-প্রধান। এই বক্তব্য প্রধান- কাব্যে মূলত তার ব্যক্তি ও অহং চেতনার প্রকাশ পায়। আর বক্তব্য শেষ পরিণতি পায় কোনো-না-কোনো তত্ত্বে। অলকার বাস্তববাদী কাব্যদর্শন হৃদয় থেকে ইন্দ্রিয়ের ধমনীজালে বিস্তৃত না-হয়ে সরাসরি পৌঁছে যায় মেধায়। তার জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা-অনুভূতি প্রকাশবাদী বাস্তবতার আলোকে কবিতায় হয়ে ওঠে বাঙ্ময় তত্ত্ব আর সত্যে। অলকার তত্ত্বান্বেষীমন শিল্পের পক্ষে কখনো কখনো ক্ষতিকর হলেও ওটি তার সহজাত; অনেকের মতো ভান নয়; ওটাই তার শিল্পতত্ত্ব।
জন্মেই চিৎকার করে কান কালা করেছি আমার মার
সে-থেকে আজও শুনতে পান না সমুদ্রের ডাক
পাখির চঞ্চল স্বর
আঁতুর ঘরের উলুধ্বনি পৌঁছাতে পারেনি বৈঠক খানায়
বাবা ছিলেন নীরব
চিৎকার অতঃপর গাঢ় ঘুমে বুঝতে পারেনি
আমার দ্বৈরথ,
ফিরবো না ফিরবো না বলে মিনতি করেছি কতকাল
শ্বাপদের ভয়ে ছিলাম গহিনে
ভালোই ছিলাম।
আমাকে আনলো কেন? এ প্রশ্ন করেছি
আকাশের নীল রঙ
মাটির জলের কাছে ...
গোলক ধাঁধায় রাজত্ব করতে এসে দেখি
আমিও ঘুরছি
(আলোর আঁধার)
মুজিব মেহদী : কবিতা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মগ্ন কবি মুজিব মেহদী। প্রচলিত কবিতার রীতি-নীতি-ভঙ্গি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নামহীন পরিচয়হীন সাধারণ মানুষ, তার অস্তিত্ব ও স্বাতন্ত্র্যকে কবিতায় তুলে আনেন তিনি। কথা বলার ভঙ্গিতে রচিত তার প্রতিটি কবিতা হয়ে ওঠে শব্দের রঙ-এ আঁকা দৃশ্যমায়া। সেই দৃশ্যের মধ্যে থাকে আবেগ, অনুভূতি, মনস্তাত্ত্বিক চেতনা আর কাল ভাবনার প্রতীক।
স্বপ্ন তাকে শুভেচ্ছা দিয়েছিলো তিমিরাকুল গিরিগুহা
আর কাকতন্দ্রা থেকে জেগে গাঙুড়ের জলে মুখ ধূয়ে সে ঘোষণা করেছিলো
অজন্তা ইলোরা... আক্রমণের জবাবে
তাকে বারবার পাল্টাতে হচ্ছিলো ছেড়াতার... মুখে ফেরা
সুর সংকটের চাপা ক্ষোভ... শিল্পহীনতার
অভিযোগ...
হেরপর কল্লো না তো কল্লো কি
জল এলো পাতিলেবু আর ঠিক প্রতিদিন প্রাজ্যপত্য দিনে সুর ভাজালো...
দেয়ালে দেয়ালে যতো গুহাচিত্রের নাম গেলো সেটেঁ আর
ছেড়াতার বাধতে বাধতে মনে দেখলো সে
মাল্য হস্তে দুয়ারে দাড়ায়ে আছে শিল্পের দেবী
হেরপর ...
(রূপকথা)
মুজিবের প্রতীকী কবিতার ভেতর আরেক ধরনের পরীক্ষটি হচ্ছে সেখানে কাহিনীর সংস্থাপনা করা। তার এই ভাবনার পিছনে হয়তো আধুনিক দর্শন আছে। সেই দর্শন-সিদ্ধান্ত তাকে কবিতার প্রচল চেহারাকে ভেঙ্গে দিতে প্রবৃত্ত করেছে।
তুষার গায়েন : নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপারে তুষার গায়েন-ও উল্লেখযোগ্য। তার পরীক্ষাটি কবিতার শরীর ভাঙা নয়। তার কৌশল একেবারেই ভিন্ন। পড়তে পড়তে যখন তুষার গায়েনের এই রকম পঙ্ক্তিতে আসি:
কি আছে সেখানে, মেরু দেশের অন্তিম সূর্য
প্রতিরোজ অস্ত যায় বিকেলের জলে
যেন সুমদ্রের নাভি থেকে রূপান্তরিত মাছ
অকস্মাৎ লুপ্তবোধে শূন্যে উড়ে যায়।
(ইকথিয়ান্ডার)
তখন সন্দেহ থাকে না তার মৌলিক কবিত্বে। তবে মাঝে মাঝে অপ্রচলিত শব্দ ব্যবহারে সন্দেহ হয় তুষার গায়েন হয়তো এক অফুরন্ত প্রতি-আকরের সন্ধান পেয়েছেন। তার জগৎ যেন বিচিত্র প্রাণীফসিল-আকীর্ণ লুপ্ত নগরসভ্যতা কিংবা সমুদ্রবেলা, অথবা শব্দমুর্ছিত এক প্রত্ন জাদুঘর।
রায়হান রাইন : আধুনিক বাংলা কবিতায় মিথের ব্যবহার লক্ষণীয়। ত্রিশের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত অনেক কবিই তাদের কবিতায় মিথ প্রয়োগ করেছেন। নব্বই দশকের কবিরাও এর ব্যতিক্রম নয়। রায়হান রাইন নব্বইয়ের বুদ্ধিদীপ্ত কবি, তার কবিতার মিথের প্রয়োগ নতুন ব্যঞ্জনা নিয়ে উপস্থিত।
তীর্থরাতের প্রভালোকে, আলোকের অর্ধকোলে ক্রুদ্ধ দেবতারা ঘুমিয়েছে আর
ক্রুশে গেঁথে আছে শেষ আলোকে রশ্মি; বাতাসে ঘোড়ার স্বর-উর্ধ্বচারী
বনবিলাসের মৃদু ডানা উড়ে আসে আমাদের কানে। নদীরেখা জুড়ে
কাঠ পোড়ানোর দৃশ্য ভেদ করে ছুঁয়ে থাকে ঊনজাল অসমাপ্ত চাঁদ,
ঘূর্ণ-মান আলোখেলা আর বৃশ্চিক বিভঙ্গে আসে ঘৃতাহুতি, দীর্ঘলয়ে অসূর্যের
সেই ক্রম সন্নিপাত।
(তীর্থ রাতের এলিজি)
রায়হান রাইন তার কবিতায় চমৎকার পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। মিথ থেকে নেয়া চরিত্রগুলো খুবই অন্তর্মুখীভাবে তার কবিতায় প্রতীক হিসেবে উপস্থিত হয়।
আমীর খসরু স্বপন : ব্যঞ্জনা বিষয়ে অবহিত হওয়ার ফলে আধুনিক কাব্যের যেমন সমৃদ্ধি ঘটেছে, অন্যদিকে এক সংকটের সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ সাধারণ পাঠক আধুনিক কবিতার আবেদনে সাড়া দিতে আপারগ। এর কারণ নানা, কিন্তু তার মধ্যে প্রধান একটি কারণ হল এই যে আধুনিক কবিতার ব্যঞ্জনা উপভোগ করতে হলে যতখানি বৈদগ্ধ এবং সূক্ষ্ম অনুভূতির প্রয়োজন, সাধারণ পাঠকের পক্ষে তা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। এদিক থেকে আমীর খসরু স্বপন-র কবিতা পাঠকের কাছে উপলব্ধিজাত হবে এই জন্যে যে, তিনি তার কবিতায় চমক প্রয়োগ করতে জানেন। চমক থাকার কারণে সে-কবিতা পাঠকের কাছে রহস্যের সৃষ্টি করে। আর রহস্য উন্মোচনে পাঠক তার কবিতা বারবার পাঠ করবেন, এমনটি বলা যায়।
ওই যে সদ্য এলেন পেকে
হাড়ের ডাল পালা থেকে
তিনি হলেন বিদ্যালয়।
আর যত মাস্টারনী-গাইনী বেরুচ্ছেন
ওই সব, পিপিলীকার মত ঝাঁকে ঝাঁকে
তারা দল বল বেঁধে।
(কলাবিদ্যার সূত্র)
আমিনুল ইসলাম : ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতাবাদী কবি আমিনুল ইসলাম। সচেতন শব্দবুননে গড়ে তোলেন তার কবিতার অবয়ব। ইতিহাসচেতনাকে তিনি তার ব্যক্তি অভিজ্ঞতার পরাকাষ্ঠে ফেলে কবিতায় নিয়ে আসেন ভিন্ন মাত্রা। এই মাত্রা তার কবিতাকে স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছে।
গৌড়রাজার একটি ঘোড়া ছিল-জওয়ান, বলিষ্ঠ ও দীর্ঘ দেহী
আর ছিল শব্দ নিয়ে খেলায় জাগলারের মতো পারঙ্গম এক কবি;
রাজা তাকেও বাগানবাড়ির এক কোণে রাজাশ্রয় দিয়েছিলেন।
ছোলা, খৈল আর সবুজ ঘাস ঘোড়াটিকে শৌর্যবীর্যের উপমায়
ভরে তুলেছিল; আর তার কাছে রাজকন্যার যাতায়াত ছিল অবারিত।
ঘোড়াটির কেশরদোলানো হ্রেষাধ্বনি প্রেমিকের আহ্বানের হাওয়ায়ী
প্রজ্ঞাপনের সমতুল ছিল;সবুজমাঠের বাতাস ফোঁড়ে তার দুরন্ত
ছুটে চলা যৌনাত্বক ব্যঞ্জনায় ভরে তুলতো দু’পাশ। মনে হতো
পৃথিবীর অঙ্গ ভেদ করে ছন্দে তালে ছুটে চলেছে দুরন্ত এক বাৎসায়ন!
দু’পাশের গুল্মলতা ঝড়ের বেতবনের মতো হেলে পড়েছে তেজস্বিত
রোমাঞ্চের ধাক্কায়। অভিভূত রাজকন্যা নিজেকে পৃথিবী ভেবে
উজানসুখে পুলকিত হয়ে উঠতো গোপনে। ঘোড়াটি ঘর্মাক্ত গা
চাটতে চাটতে হাঁপাতে থাকলে রাজকন্যা হাত বুলিয়ে দিতো তার পিঠে।
(কবি ঘোড়া ও রাজকন্যার গল্প) পৃ- ৫৫২
কুমার চক্রবর্তী : প্রকৃতি ও রোমান্টিক চেতনা কুমার চক্রবর্তী-র কবিতার মূল সুর। ব্যক্তি অনুভবকে তিনি নস্টালজিক চেতনা দিয়ে তার কবিতায় উপস্থাপন করেন। উপস্থাপনার শৈলী এতটাই হৃদয়গ্রাহী যে পাঠক তাতে মুগ্ধ না-হয়ে পারে না।
বিষাদক্রান্ত হলে তুমি এসো এই মৌন নদীর ধারে, দেখবে তোমার রক্তের
ভেতর নিহত ঘুমেরা আবার নড়াচড়া শুরু করে, আর তুমি শুনতে পাবে সেই
আধিবদ্যক ধ্বনির গুপ্তকথকতা।
নদীও ধরে রাখে সমুদ্রের ছবি। একাগ্র প্রেক্ষিত, ও অদৃশ্য মনস্তত্ত্ব।
আমরা মূলত পরিযায়ী পাখি, ঠোঁটে করে আনি হিমঋতু, আর অদৃশ্য ভুবনের গান। যখন ত্বক হয়ে ওঠে ভরপুর তখন মৃত্যু আমাদের ডেকে নিয়ে যায়। আমরা ফিরি কিন্তু দৃশ্যকে বিন্যস্ত করি না। ফলে যে দ্বন্দ্বসূত্র এখন আবর্তনশীল তার অস্পষ্ট সীমারেখা ধরে বার্তাবহ হই বারবার।
(সমুদ) পৃ- ৫৬৪
সাইমন জাকারিয়া :আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির মরমী চেতনার কবি সাইমন জাকারিয়া। কবিতায় মরমী চেতনাকে আধুনিক অনুসঙ্গে উপস্থাপনের দক্ষ এই কবি বাংলা কবিতার ঐতিহ্যসিদ্ধ পথকে অনুসরণ করেন অবলীলায়। লক্ষণীয় :
আমি এমন এক দেশ ঘুরে এলাম- যে দেশে আগ্নেয় অস্ত্র হচ্ছে আদি ও
আসল মানুষ। গোপনে ও প্রকাশ্যে সে দেশে মানুষকে বশ করে এবং মানুষকে
ভজনা করারই সাধনা চলছে। শুধু তাই নয়- সে দেশের মানুষ আগ্নিকে
আদর করে নূর বলে ডাকে। তারা বলে- একখ- নূরেই বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডের যত কীর্তি। মা পিতা ভূ-খ- গ্রহ তারা রবি নবী রসূল আল্লা কিংবা ঈশ্বর ইত্যাকার
সবকিছুর মূলেই সেই অগ্নি ..... এরপর সে দেশের মানুষ আগুনের উপাসনা করে না, বরং অগ্নিজাত মানুষ ভজনা করে। তারা বলে- মানুষই আদি ও আসল আগ্নেয়। কেননা, একমাত্র এই মনুষ্য দেহ-ই-মাটি পানি বায়ু আর নূরের লীলা জানে। আর মানুষকে দিয়েই এই অনন্য ভবন গড়া হয়েছে।
(যে দেশের মানুষ আদি অগ্নিকে আদর করে নূর বলে ডাকে) পৃ-৬১৯
সাখাওয়াত টিপু : কাটা কাটা বাক্যে টুকরো টুকরো ব্যক্তি-অনুভবকে কবিতায় একদম নিজস্ব ধারায় প্রকাশ করেন সাখাওয়াত টিপু। জগৎ, জীবনকে স্বতন্ত্রভাবে অনুভব করার অনুসন্ধানী এই কবি। কবিতায় প্রশ্নজিজ্ঞাসা ও অনুধ্যানকে বারবার উচ্চকিত করে তোলেন। সে কারণেই তার প্রকাশের এক ভিন্ন কণ্ঠস্বর লক্ষ করা যায় কবিতায় ।
মন গেল কার প্রাণে প্রেম নাকি তত্ত্ব মানে
ইতল বিতল কণা কণা প্রেম
এম মেঘ ধর ছেদ ঝড়ে ঝর দেহ ভেদ
উড়িয়া ঘুরিয়া ফোটে ওরে শ্যাম
রাখি অঙ্গ দোলা ফুল ফোটা ফোটা মশগুল
ন নামি নদীর ক’লে উদাসীন
কায় মানে তিক্ত রস প্রাণে হয় দেহ বশ
দেহ কেন নদী হয় বিষ্টিহীন
(বরষার প্রেমতত্ত্ব) পৃ- ৬১৯
শামীম সিদ্দিকী : মননগতভাবে নিভৃতচারী কবি শামীম সিদ্দিকী। তার কবিতায় প্রেম, প্রকৃতি ও অস্তিত্ব চেতনা অন্তরঙ্গ সুরে প্রকাশিত। অনুভূতি প্রকাশের শব্দকে কবি শামীম সিদ্দিকী তার স্বভাবজাত কাব্যিক তাড়না দিয়ে চিত্রিত করার ক্ষমতা রাখেন। যা নব্বইয়ের কবিতার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।
এতই সামান্য আমি, না থাকলেও চলে
দক্ষিণ ও পূব থেকে বাতাস এসে খেলে
পৃথিবীর খবরগুলো ধুলোবালি;
পাতা করে মানুষের আয়ু
যতই বিলুপ্ত হোক গাছপালা
সকলেই ছায়া উপাচারি
পারস্পারিক হত্যাগ্রহ ছাড়া
পথের কিনারে থাকে
অচেনা জলপাই,
ঘরে তুলে নিয়ে যাই টুকরো টুকরো ছায়া
উপদ্রুত ছায়া অন্ধকার
তাদের আমি পাশে পাশে পাই
(ছায়া) পৃ- ৬১১
শান্তা মারিয়া : কবিতায় গল্পবলার এক অনিবার্য ঢং লক্ষ করা যায় নব্বই দশকের কবিতায়। এই দশকের কবিরা কবিতার গল্পে ব্যক্তি ভাবনার পাশাপাশি ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুসন্ধানের রীতিকে প্রয়োগ করেছেন সফলভাবে। এই ধারার কবি শান্তা মারিয়া। তিনি তার কবিতায় ইতিহাস-ঐতিহ্যকে আধুনিক মনন দিয়ে উপস্থাপনে যেমন সচেষ্ট থাকেন; তেমনি ব্যক্তি ও ব্যক্তির অনুভবের প্রতিফলনও ঘটাতে পারঙ্গমতার পরিচয় দেন।
তক্ষশিলা থেকে ক্রমশ পূর্বগামী বিষ্ণুগুপ্ত চাণক্য আপনি জম্বুদ্বীপের রাজ্যচক্রবর্তী সন্ধানে ব্যপৃত ছিলেন। মান্যবর আর্যবৃক্ষ বন্ধুত্বের পরিধি নির্ধারণ করে বলেছিলেন, উৎসবে, ব্যসনে, দুর্ভিক্ষে, রাষ্ট্রবিল্পবে এবং শ্মশানে যে সহচর হয় তাকে বন্ধু বলে আপনি রাজি আছেন। বন্ধুবৎসল আপনার আদৌ কোনো খ্যাতি ছিল কি? পৃথিবীর মানবগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত প্রতিটি মানবসন্তানই কি একে অপরের বন্ধু (কিংবা সহযোগী যাই বলুন) অযথা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দী নয়? প্রাজ্ঞ ডারউইন অন্তত আমাদের তেমন সন্দেশই দিয়েছেন এবং সাহিত্য আর ইতিহাস যত বন্ধুত্বের সংবাদ জোরোশোরে বা চুপিচুপি আমাদের কানে পৌছে দেয় তাতে পাড়ভাঙার আওয়াজ বড় বেশি প্রকট। হায় নির্বোধ বালকের দল, তোমরা কি জানো না নর ও নারায়ণের মতো জন্মান্তরে বয়ে চলা অক্ষয় বন্ধুত্বের ভাগ্য তোমাদের বিধিলিপি নয়। তোমাদের চারপাশ ঘিরে আছে ব্রুটাস আর জুডাসের দল। মহামান্য জুলিয়াস সিজার, রুবিকনের সেতুটি পুড়িয়ে দেবার আগেই আপনি জানতেন পিছু ফিরে তাকাবার প্রয়োজন নেই, সামনে তখন অপেক্ষা করছে রামের সুসজ্জিত তোরণ। বন্ধুত্বঃপ্রয়াসী নির্বোধ আমি একদিন পৃথিবীর সব শব্দকে অতিক্রম করে অল্প কিছু নিঃশব্দকে ধারণ করতে চেয়েছিলাম। গুণাধ্যের মতো শুধু সংস্কৃত, প্রাকৃত ও দেবভাষা নয়, আমি যাবতীয় শব্দের সেতু পুড়িয়ে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু নিঃশব্দের ব্যাকরণ বড় অদ্ভুত। তারা তোমার ভাষা কেড়ে নিতে পারে অযথা তোমাকে উপহার দিতে পারে ডেলফির মন্দিরের দৈববানী। এখানে ব্রাকেটবন্দী করে বলে রাখা ভালো- নিঃশব্দের নিবিড় প্রেম আমাকে উপহার দিয়েছে ছায়াহীন
অনিঃশেষ রৌদ্রযাত্রা।
(মধ্যরাতের জার্নাল) পৃ-৬০৮
সমর চক্রবর্তী : কবিতায় আবেগ ও যুক্তির ভারসাম্য নির্মাণে সচেষ্ট কবি সমর চক্রবর্তী। রোমন্টিক চেতনাকে নস্টালজিক আবহে উপস্থাপন করে তিনি তার কবিতার স্বতন্ত্র রূপ নির্মাণ করেছেন। সেই সঙ্গে নাগরিক জীবনের হতাশা, সংকট, আশা ও সম্ভাবনাও তার কবিতায় উঁকি মারে।
বৃথাইতুমি সাজিয়েছো বৃত্ত ফুটপাতের মশাল ঘিরে
ভ্রমণের অন্তত গৃহে বৃথাই ব্য হয়েছে শূন্য তোমার
ঝুলে আছে প্রশ্ন তরুপ ছোঁয়া আঙ্গুলের উপর!
তুমি শুধু সাক্ষী থেকে গেলে- অদ্ভূত আলোর এ অন্ধকারে
আর ওই যে দিক চলে গেছে পরিধিহীন গন্তব্যের লাল চোরাবালি-
যেখানে পরম তৃষ্ণার পর উপভোগ্য পতন আসে; কাতর নদী
মলিন মায়াজালে আটকে রাখে আলোয়ার শরীর
(অনঙ্গ সহবাস) পৃ- ৬১৬
মাহবুব আজীজ : আত্মজৈবনিক ধারার কবি মাহবুব আজীজ। ব্যক্তিগতবোধ আর উপলব্ধিকে তিনি শব্দ যোজনায় নিপুণভাবে তুলে আনেন কবিতায়। তার কবিতা পাঠককে নিয়ে যায় দার্শনিক ভাবনার দিকে।
পাশের চেয়ার থেকে উঠে চলে গেলে;
মৃত্যুর কালো অন্ধকারে
আমি নিজেরই মৃত্যু দেখলুম সবিস্বয়ে;
আমি স্পষ্ট দেখি তোমার একলা প্রস্থান
আমার সামনে আমারই মৃত্যু উপস্থিত দেখি।
খুব নিভৃতে খুব গোপনে তাই খুন হয়ে যাই
কিছু বুঝে উঠবার আগেই সাই সাই শব্দ;
আমোদ-আহ্লাদ-দুঃস্বপ্নেরা আগের মতোই
রয়ে যায়। যার যার ঘরে।
আমি শুধু একা খুন হয়ে যাই।
(খুন)
মুজতবা আহমেদ মুরশেদ : প্রকৃতিচেতনা আর সমাজভাবনাকে সমন্বিত করে কবিতায় একটি মননশীল ধারা তৈরিতে আত্মনিমগ্ন কবি মুজতবা আহমেদ মুরশেদ। বাংলা কবিতায় এ প্রচেষ্টা দুর্লক্ষ নয়। তার সফলতার জায়গাটি হচ্ছে সহজ, সরল ও আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করে- তাকে গভীর প্রত্যয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারেন।
সবুজ পাতার মতো আমার এ শরীরের খোলে
যা আছে জমিজিরাত, ক্ষেতখোলা নদীনালা
সব তোমারে দিব গো কন্যা, সব ব্যবহার্য,
দিব পৈত্রিক নিয়তি আকাশ।
তোমারে দিব গো কন্যা রঙিলা এক জিয়লমাছ
দিব আমার আখেরের যত পূণ্য চাষ
যদি তোমার অধরের সুমিষ্ট কোনায় তুমি
একবার খেয়াখানা ডুবাও করে আমার সর্বনাশ!
(এপিটাফ)
ওবায়েদ আকাশ: আধুনিক মনন আর লোকসংস্কৃতির প্রতি প্রবল আগ্রহ নিয়ে নব্বইয়ের দশকের কবিতায় স্বতন্ত্র ধারা সূচনা করেছেন ওবায়েদ আকাশ। টানাগদ্যের কবিতা নির্মাণে স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য লক্ষ করা যায় তার কাব্য-প্রকরণে। তিনি একজন রোমান্টিক কবি; তবে তার রোমান্টিকতাও একেবারে বাস্তবতা বিবর্জিত নয়। কবির সমাজসচেতন মানসিকতাই তাকে রোমান্টিক ভাবাবহে একেবারে ভাসিয়ে যেতে দেয় নি। দৃষ্টান্ত:
কিছু কথা গ্রামগঞ্জে ফলে। পাথর নিয়ে অতিরিক্ত কথাগুলো থেকে গেল আঞ্চলিক ভাষায়।
ভেবেছি পাথর শানানো গাঁয়ে কিছু কিছু কৈশোরিক বিচরণশীলা পা মুছে গেল কিনা।...
এবার মেঘ বৃষ্টির ঋতুগুলো বরাদ্দ হলে ইলিশের মৌসুম ধরে তোমাদের বেড়াবার প্রসঙ্গে
যথার্থ ভেবেছি। তখন তো ধোঁয়া ওঠা হলে ভোরের প্রসঙ্গ এলে ব্রিজের তলায় নেমে পাথরের
জটিলতাগুলো নিরীক্ষণ করি।
(পাথর সংক্রান্ত আঞ্চলিক কথাগুলো)
ওবায়েদ আকাশ তার বেশকিছু রূপক কবিতায় শ্লেষ আর গল্পের বীজ রোপনে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।তার এই ধারার কবিতাগুলো পাঠক-সত্তারআর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক চেতনাকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়; আমাদের ভাবায় ও ভাবনার গভীরে নিয়ে যায়।
শামীম রেজা : নব্বইয়ের দশকের কবিতায় নতুন প্রতীক-উদ্ভাবন, বিজ্ঞানমনস্কতা, তত্ত্বগভীরতা আর শিকড়-ঐতিহ্যের পুনরাবিষ্কারের প্রচেষ্টা একটা লক্ষণীয় দিক। এই ধারার উল্লেখযোগ্য কবি শামীম রেজা। তিনি তার কবিতায় নস্টালজিয়া আবহ তৈরিতে পারঙ্গম। নস্টালজিয়ার দুর্নিবার আকর্ষণ তার কবিতাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।
ঝর্নারাত নীরব হলে বসন্তবৃষ্টি গায় মেখে শুয়ে থাকে রাতপাখির
পালক বুকে করে স্মৃতিকণা... ঘুমচোখে আরাধনা সঙ্গীত শোনে রমণ
বিভ্রমে,সোনাঘুঙুর নদী বয়ে চলে স্মৃতিকণার আনন্দরমণ শ্বাস ক্লান্ত হলে গাঢ় হয় পাললিক মেঘ, আমি তখন কাঁচপুরগ্রাম, ধানশাঁই-ধানময়ী
নদীজলে কচুরীপানার মত ভাসি মুহ্যমান ছায়ার আদর পাব বলে...
আরণ্যক সকালে, বিরহ সন্ধ্যায় চুড়িভাঙা শব্দে জেগে উঠি... স্বপ্নে...
রেশমী নিপুণ নূপুর কারুময় কথন কয় স্মৃতিকণা...
(ওসালিয়া-এক)
নস্টালজিয়ার এই প্রেরণা-শক্তিকে ব্যবহার করে শামীম রেজা আমাদের অন্তর্গত স্মৃতিচেতনায় লুকিয়ে থাকা প্রত্মপ্রাচীন ঐতিহ্য আর জীবনচরিতকে নিপুণভাবে তুলে আনেন কবিতায়।
রহমান হেনরী : নব্বই দশকের উল্লেখযোগ্য কবি রহমান হেনরী। আত্মজৈবনিক রোমান্টিক এই কবির কবিতায় বাংলাদেশের নিসর্গ-প্রকৃতি, লোকজীবন ও তার সংস্কৃতি সৌন্দর্য চেতনা নিয়ে প্রকাশিত। আধুনিক জীবনবোধের সঙ্গে নিসর্গ চেতনাকে মিলিয়ে নিয়ে তিনি তার কবিতাকে পাঠকের কাছে তুলে ধরেন শব্দশিল্পের অনন্য দৃষ্টান্ত রূপে।
সমুদ্র গর্জনের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে আমি বহু বহু
দূর-স্বজনদের আর্তনাদ শুনলাম; তবে কি গাঙচিলেরাই
এতকাল ঠোঁটে ঠোঁটে বহন করে এসেছে মানুষের যন্ত্রণা ও তার পরাজিত উত্তরাধিকার!
বালুতে আছড়ে-পড়া অগগন ঢেউয়ের স্ফূর্তি আর মডেলকন্যাদের প্রিয় সাবানের ফেনার মতো বুম্বুদ দেখেই একদিন জেনে ফেলেছি,পৃথিবীর কোথাও না কোথাও রয়েছে বিপুল পর্বতমালা; পাহাড় কাটতে কাটতে তুমি যতই সমতল বানাও- পালাতে চাও সমুদ্র ঠিকঠাক ধেয়ে আসছে তোমার দিকেই; আমি সমুদ্রবর্তী এবং আবারও নিমগ্ন হচ্ছি বিশ্রুত সেই গানে নির্বোধ ঢেউয়ের বিপুল বিস্তারে যার সুরের সঞ্চালন; আর বাণী- এতই নিরুচ্চার যে, মৌনতা তার পক্ষে কোনও যোগ্য অভিধাই হতে পারে না;
(নৈঃশব্দ)
হেনরী স্বপন : প্রায় আক্ষরিক অর্থেই আত্মজৈবনিক কবি। সামান্য কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া তার প্রায় সব কবিতারই বিষয় তিনি নিজে। অর্থাৎ তার দেখা অভিজ্ঞতার জগত নিয়ে খুব সুকৌশলে তিনি তার কবিতায় প্রবেশ করেন। তার দেখা জঙ্গল, বাগান, দুপুর, রোদ্দুর, চেনা পাখি-হরিয়াল, বুনো-প্রজাপতি, ধানক্ষেত, ছোট ছোট সামান্য দৃশ্য, তার অভিমান, স্নেহ, নিঃসঙ্গতা, নিষ্প্রভ ভালোবাসা, তার নিজেকে সাময়িকভাবে নতুন করার উজ্জ্বল ইচ্ছেএই সমস্ত নিয়েই তার মৌলিক অনুভূতির সঞ্চারণ।
একদিন ফড়িং বালিকার পিছে ছোটাছুটি করেছি অনেকজঙ্গলে বাগানে তেতুল ছায়াও ছিল দুপুর রৌদ্দুরে ভরা…
চেনা পাখি-হরিয়াল ছেলে মেয়ে ধানক্ষেত
কুয়ায় তৃষ্ণার জল।
(নিসর্গের বাল্যকাল)
বায়তুল্লাহ কাদেরী-র কবিতায় এক ধরনের অবদমনেরও চাপ দেখা যায়। গভীর মর্মমূলে লুকিয়ে আছে মানবিক অবদমনের এক রহস্যময় দেয়াল। এর কাছ থকে মুক্তি হয়তো আছে, কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় আমাদের সভ্যতাপীড়িত মানুষেরা এই অবদমনের বাইরে যেতে পারে না। বায়তুল্লাহ সেই অবদমনকেই শিল্পিত বাক্যের বাঁধনে গেঁথে তৈরি করেন কবিতা।
কবেকার গন্ধময় জৈগুণ বিবির
কিচ্ছাকে শুকাতে দিয়ে বরেন্দ্রর ঘাসে
ফিরোনি পুত্তর তুমি ভাবুক, দ্রাবিড়
খোয়া-ঝরা সকালের আনন্দ-সুবাসে
[...]
গন্তব্যরহিত বলে জন্মেই থেমেছি
অবাক বিস্ময়ে শুধু নীলিমাই দেখি
বৃষ্টি-বরণের দিনে জলদ নেমেছি
সখির উরুর মতো উন্মাতাল ঢেঁকি।
(অনার্য মাদুলী)
মোস্তাক আহমেদ দীন : সীমার মধ্যে অসীমানুভবের বেদনা কবির বিরহানুভবের সমপর্যায় ভুক্ত। তাই অসীম প্রেমানুভূতি আর অসীম সৌন্দর্যচেতনা যে আকাক্সক্ষা সৃষ্টি করে, তার পরিপূর্ণতা কোনো জীবনেই ঘটে না। মোস্তাক আহমেদ দীন নব্বই দশকের আরেকজন স্বতন্ত্র ধারার কবি। তার কবিচেতনায় সীমার মধ্যে অসীমানুভবের বেদনা তাকে দংশিত করে বেড়ায়। মোস্তাক আহমাদ দীন তার কবিতায় যে-কথাগুলো বলতে চান, সেই কথার অন্তরালে এক ধরনের মরমীচেতনা থাকে। তার চেষ্টা থাকে যে-বিষয় নিয়ে তিনি বলতে চান সেই বিষয় উপযোগী ভাষা নির্মাণের। আর সংগত কারণেই তার শব্দ ব্যবহারের একটা টেকনিক আছে। আর তাই তার শব্দগুলো কখনো দেশজ, কখনো আঞ্চলিক। আবার বাক্যের বুননের মধ্যে সাধু ও চলিত ফর্ম পরিলক্ষিত হয়।
এত বিষদেহ কাদের, দেহে
আজ আমি সংলগ্নজনেরে বড়ো দূরে যেতে বলি
সকলেই একথা বোঝে আমি কভু ডুবিনাই জহরের জলে দেহকা-ে তবু এত বিষ
ভাবি তাই প্রাণের মধ্যে কোন সর্পঢুকে গেছে ঘুমে
এ সন্দেহ মুক্ত হতে বংশকাহিনী যারা পাঠ করে গেলে তারা দেখে
পিতা বা প্রপিতাসহ আলস্য করেনি কেউ
মনসা-পূজায়
তবে হই অভিশপ্ত কাহার সন্তান?
(বিষ)
আশরাফ রোকন : মানুষের শূন্যতা কোনোদিনই পূর্ণ হয় না; তাই রোমান্টিক-মানসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য সেই শূন্যতা বা অভাব মনের মধ্যে শুধু একটা সীমাহীন হাহাকার সৃষ্টি করে; আর এই হাহাকারঘেরা স্মৃতিটুকু নিয়ে অসহায় বেদনায় মথিত মানুষ মহাকালের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তখন মানুষ দেখতে পায় সৃষ্টির মধ্যে একটি বিরাট অসঙ্গতি। আর এই অসঙ্গতিকাতরতাই কোনো কোনো কবিকে আলদাভাবে চিনিয়ে দিতে পারে, নব্বইয়ের কবিতার ক্ষেত্রে নিয়ে আসতে পারে একটি নতুন বৈশিষ্ট্য। এমনই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী কবি আশরাফ রোকন । তার কবিতায় উপমা খুব তীব্রভাবে ক্রিয়াশীল। কাব্যের বাক্য গাঁথুনিতে বারবার ছকবাঁধা গতানুগতিক জীবনে প্রতি বিতৃষ্ণা দেখিয়েছেন এবং এই জীবন যে ছায়াবাজি সে কথা বলতে দ্বিধা করেন নি।
আধবোজা ফুলের মতন আমাদের চোখে এখানে
নির্জন পথের চিত্র, দুঃখহীন স্বপ্ন
আকাশ ভেঙ্গে পড়েনি এখনো নিজেদের হাতের ভিতর
তাইতো অমন গরম পীচের পর বসে আছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা
আমার কোন পরিচয় নেই।
(পরিচয়)
আদিত্য কবির : এক সার্কাসের এরিনায় বা শেষ রাতে গলিত মাতাল সেজে বা শহরজীবনের জটিল গোলকধাঁধায় বা কোনো লোভদৃষ্টিমান ভ- সেজে আদিত্য কবির কখনো বিদূষক, কখনো কারো কারো প্রতি দারুণ আসক্তি পরায়ণ, কখনো বেপরোয়া লম্ফবাজ, কখনো অসহিষ্ণু অবাধ্য দুরূহ রোগীর ভূমিকায় অভিনয় করছেন। আমাদের পরিচিত এই খুঁটিনাটিসমেত বাস্তবজগৎই অস্বাভাবিক হয়ে
দেখা দেয় আদিত্য কবিরের অদ্ভুত মানসিকতার সংক্রামে বিচলিত ও বিকৃত হয়ে। কবিতায় তিনি সেই অদ্ভুত মানসিকতার সংক্রমণই ঘটান। কবিতায় আত্মজৈবনিক ধারায় নিজের উপর এই বিকৃতি আরোপ, এই ক্লাউনের ভঙ্গি বা সার্কাস-ম্যান সাজা গভীর এক অভিমানপ্রসূত। এ অভিমান কবির অভিমান। যা আত্মজৈবনিক কবির ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। আর তাই তার প্রায় প্রতিটি কবিতাতেই এই অবদমিত অভিমান বেরিয়ে আসে আত্মজৈবনিক প্রক্রিয়ায়। যা নব্বইয়ের কবিতার নান্দনিকতার ক্ষেত্রে ভিন্ন ধারার স্মার্টনেস তৈরি করেছে
দু’চারটে আধুলীর জন্যে বিক্রি হয়ে গেছো পথে ঘাটে
এমনকি প্রয়োজন পাবলিক ফোন?
অনেক অনেক দিন সার্কাসে কেটেছে দিন রাত
সই কথা মনে পড়ে হঠাৎ কী প্রিয় ভানুমতী?
তাকে নয় আমাকে না
অন্যঘরে ক্রমাগত ফোন করে গেলে,
জানো না এসব কথা লিফলেটে ছড়িয়ে পথে।
(ভানুমতী-২)
ব্রাত্য রাইসু-র কবিতায় সুররিয়লিস্ট চেতনার ভেতর ব্যঙ্গ বা শ্লেষ প্রয়োগের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কবিতার চরিত্রের উপর মনোবিকলন, শ্লেষ ও বিকৃতির প্রভাব দিতে গিয়ে বাত্য রাইসু বসড়ঃরড়হ ও রহঃবষবপঃ-কে নির্ভার করে তোলেন। তার কবিতার আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় সেটি হচ্ছে গল্পের চমক। আর সে গল্পটার ভাষাও নিরাভরণ বাস্তবতা দিয়ে সাজানো। শব্দ ব্যবহারের প্রতি তার কোনো আলাদা সচেতনতা নেই। যে-ভাবে কথায় বলা যায়, সে-ভাবেই কথ্যরীতির আদলেই তিনি তার কবিতাকে তৈরি করে নিয়ে আসেন। তাই ব্রাত্য অনেকাংশেই বৈদগ্ধ, শব্দসমৃদ্ধি ও প্রথাসাচ্ছল্য থেকে অনেক মুক্ত, নির্ভার। এটাই তার নান্দনিক প্যাটার্ন ও দার্শনিকতা।
শুদ্র ও ব্রাহ্মণ কন্যা। পরস্পর এক বিছানায়। শুয়ে থাকে। দুপুরে। তাদের ঘরে যাই। তারা উবু হয়ে শোয়। হাসে। বলে, ‘আমরা কিন্তু রতি জড়। আমরা কিন্তু প্লেটোনিক লাভ করি। আমরা অন্য সবার মতো না’
অথচ অপর্যাপ্ত মেয়েরা কাঁদতে কাঁদতে আসে। কাঁদতে কাঁদতে যায়।সোনামণিদের ব্রেস্ট ছোটো। কিন্তু মন বড়ো। কেউ তা বুঝতে চায় না। অথচ।
অথচ সৌন্দর্য নিয়ে আমাদের ভাবনা চিন্তা,অন্যরকম। আমরা খুব যুক্তি ভালোবাসি। ঘোড়াদের মতো। দাড়িয়ে পেচ্ছাব করি আমরা।
(স্যান্যাটোরিয়াম:৫)
পাঁশু প্রাপণ-এর কবিতার ভাষা তার মৌলিক সৃষ্টি। এই নিজস্বতা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে থাকার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। কেননা ভাষার সর্বজনীন সরল রূপ না-বের হয়ে এলে পাঠকের কাছে কবির কাব্যভাবনা উদ্ভাসিত হতে পারে না। তবে বাংলা কবিতার পাঠক জীবনানন্দ দাশের কাব্যভাষাকে যেভাবে আবিষ্কার করেছেন, তা থেকে আমরা দাবি করতেই পারি পাঁশু প্রাপণের ভাষাও নব্বইয়ের পাঠক উপলব্ধি করবে। তার ভাষার আলো-আঁধারি ভাব ও ঘোরকে পাঠক গভীরভাবে অনুভব করবেন। আদতে পাঁশু প্রাপণ পাঠকের অনুভূতিতে ভাষার এক রকমের ধূসরতা সৃষ্টিতে বিশ্বাসী।
গৃহ থেকে অন্যগৃহে উপাত্তের মৌল ক্রীড়া সংখ্যার বিভাগে
দ্বৈপায়ন বৃত্তিমতে অনুকৃতি রেখে যায় এমন বলয়ে
যে-বলয় চতুর্বৃত্তে উদ্বৃত্ত রশ্মির মতো স্বর্ণনাভ, আর
ঘন সন্নিবিষ্ট বর্গে তৃণাঙ্কুর রেখে আনে ষষ্ঠী অসূয়া’র।
(উপাত্তের জন্মদাগ, অমিয় উপাত্তকৃতি)
রিষিণ পরিমল : প্রায়শই স্মৃতিকাতর এক রোমান্টিক দৃষ্টিতে অতীতকে, ঐতিহ্যকে আঁকড়াবার চেষ্টা করেন; তাই যা গতায়ু, যা চলে যেতে বসেছে, যা ভাঙা বা ভাঙতে বসেছে, যা পুরানো তার কথা ছবির মতো ফুঠে ওঠে তার কবিতায়। তার কবিতায় বিষণ্ণ পরিবেশ ছড়ানো থাকে। মূলত পঞ্চাশ-ষাট দশকে যে অল্প ক’জন কবি সুরম্য শব্দশিল্পে শোভন কোমলতা ও বিষণ্ণ আবেগ-মাধুরীর চর্চা করেছিলেন, রিষিন পরিমল তাদেরই উত্তরসূরি। তাই তার কবিতায়; শব্দানুষঙ্গে চিত্রল সৌন্দর্যের অনুভূতির অনুরণন বাজে।
হলুদ রমনী দাঁড়ায় রাত্রিদাহ অগ্নিকিনারে
তার স্তন ছোঁয়, গ্রীবা বাঁধে অগ্নিশ্বর
নিতম্বছায়া তার আকাশচারিণী।
(বিশিশ্ন)
মজনু শাহ : শব্দই স্মৃতি। শব্দই অভিজ্ঞতা। শব্দেই গান। শব্দেই অনুষঙ্গ। আধুনিক কবিতার ক্ষেত্রেও শব্দই অবিজ্ঞান। কবিতার ধ্বনিগত-কাঠামোর প্রধান উপাদান শব্দ। সংগীতে ধ্বনি যতই সুর-সংযোগে আভিধানিকভাবে অর্থ-ব্যাতিরিক্ত, অথচ সার্বজনীনভাবে আবেগবহ হতে পারুক না-কেন, কবিতায় অর্থ-নিরপেক্ষ ধ্বনি অসম্ভব ও অবাঞ্ছনীয়। তাই নব্বই দশকের কবি মজনু শাহ জানান:
ও পত্রালোক।
বায়ু সেবনের সময় কিছু বাড়িয়ে দিও।
(নৈশ প্রহরী)
এখানে ‘ও’ শব্দ শুধু শব্দ নয়, ধ্বনিও বটে। প্রকৃত প্রস্তাবে, স্বভাবের সহজাত রোমান্টিকতাকে লুকিয়ে রাখাই তার মুখ্য উদ্দেশ্য। তার কবিতা সচেতনভাবে পাঠ করলে দেখা যায় যে ‘বিশ্লিষ্ট বোধ’(dissociation of sensiblity)-এর তাগিদে তিনি অগ্রসর হয়েছেন, তা শেষ পর্যন্ত তার কবিতায় স্বপ্ন ও সুন্দরের যুগ-মিলন সংগঠিত করে।
বর্ষা স্বপ্নে আরো ধারালো হলো কদম
রোদ কদম
কদম্ব
হতভম্ব জীবনে তুমি কোন লিঙ্গ
এতটা গোলাকার হয়ে
আমায় কি বোঝালে তুমি
(কদম গাছের সহনশীলতা)
বায়েজীদ মাহবুব : নব্বই দশকের মেধাবী কবি। দার্শনিক মননশীলতা আর পাশ্চাত্য কবিতার অনুধ্যান নিয়ে মিথ আর জ্যামিতিকে কবিতার কণ্ঠস্বরে মেলান। তার কবিতায় ক্রমশ সরব থেকে জটিল চিত্রকল্পের প্রচ্ছায়া লক্ষণীয়।
একখানি ডিটেল মনে থাকে, ছায়াসহ
পরিপ্রেক্ষিত আরোপের আগে।
অমল মধুর গৃহ তারপর তত্ত্বে ভেঙে যায়
নগরে গজায় এমন ঘরবাড়ি
যেন কোনো দুর্ঘটনার ফল।
(মহাস্থপতি)
কিংবা:
জন্মাবে অনেকেই, কিন্তু সে তো ঘটবে ভবিষ্যতে
কোনটি সে গর্ভ (জানবে না কেউই) জন্মের অনুকূল
আর এও কি সম্ভব যে আমি, তর্কালংকার মদনের ছাত্র
জন্ম নেবো, যেভাবে জন্মাবে সিন্থেটিক, শীলভদ্রগণ, অনুমতিভ্রমে
(বোর্হেসে)
আহমেদ স্বপন মাহমুদ : ইমেজ প্রয়োগে জীবনানন্দীয় প্রকরণের প্রচ্ছায়া; আর নব্বই দশকের আধুনিকতার সমস্ত সুর নিয়ে স্বমহিমায় উজ্জ্বল আহমেদ স্বপন মাহমুদ-এর কবিতা। তার কবিতায় রং আর রেখাগুলো ক্রমশ বাস্তবতা থেকে অতিবাস্তবতায় ধাবিত হয়, যা ক্রমে একটি চিত্রমায়ার সূচনা করে।
রেখা বিস্তীর্ণ হলে বর্ণ ক্রমাগত নীল হয়
সুদূরের যে পথে তুমি
রেখা ক্রম সেই পথে ধায়
একটি ঘোড়া দৌড়েছিল কাল সুতোর ওপারে
রোমগুলো তার কাঁপছিল নীলরঙে মাখা
আমি ঘোড়া ভালোবাসি
এবং বর্ণসমেত ক্রম করেছি যাত্রা রেখাপথে
(রেখা)
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ : অস্তিচেতনার পাশাপাশি সময়ের অস্থিরতা, মানসিক যন্ত্রণাÑএসব গ্রাস করে নেয় আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ -র মনকে। যেমন:
মীন, আমার ধৈর্যচ্যুতি হয়। সহস্র বছর কূলে বসে থাকা, ও হো মীন
আমার ধর্মচ্যুতি হয়। তুমি জল ছেড়ে উঠছো নাÑএই প্রার্থনার রূপ দেখছো না।
(মীনকে)
এক অখন্ডের সৌন্দর্যময় জীবনের প্রার্থনা করেন আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ। তবে তার কবিতায় বাসনা রক্তিমতা থাকা সত্ত্বেও সেখানে নেই কোনো আনন্দের স্পন্দন; আছে এক জাতীয় স্মৃতিতাড়িত বিষাদ বেদনা।
দৃষ্টান্ত:
সব সুন্দর প্রকাশ করে আছে ফুল; যেনো শবগাড়ি
আমাকে বহন করে নিয়ে যাবে আগুনের নিচে
আগুন গান্ধর্ব প্রথা, জীবন্ত মানবদেহ-চিন্তা আমার জন্ম দিনে!
অর্থাৎ এই ফুল দৃশ্যে আমি শব, নিরালোকের পথিক হয়ে যাই
আর মরলোকের বাসিন্দা হয়ে যাই।
(ফুলকে)
তপন বাগচী : নব্বই দশকের ছন্দ সচেতন কবি তপন বাগচী । তার কবিতায় অস্তিত্ববাদী চেতনার উপস্থিতি গভীরভাবে উঠে আসে ব্যক্তিসত্তা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও অহং চেতনার মধ্য দিয়ে। মিথ ও ঐতিহ্যের পুনর-বয়নে পাঠককে কবিতার নির্মল আনন্দে প্লাবিত করতে চান এই কবি।
আমার আনন্দবৃক্ষ জন্ম নেয় বোধের ঔরসে
তারপর পার হয় যশোমতী স্বপ্নে শৈশব।
আমি জানি কতোটা চর্যায় আনন্দেরা পুষ্ট হয়
কতোখানি প্রক্ষালনে ঝলসে উঠতে পারে
অলঙ্কৃত শাখা আর উপমিত পাতা।
বৃক্ষেরা দাঁড়িয়ে থাকে
অন্তহীন সময়ের দায়ে
সেই তার হাসিকান্না, অস্তিত্ব-ঘোষণা
আমার আনন্দবৃক্ষ অকাতর হেঁটে যায়
হাজার বছর
গায়ে তার চিরন্তন ছন্দের নূপুর
এই তার ব্রজবুলি,
এই তার যোগ্য প্রতিবেশ।
(আনন্দ বৃক্ষ)
শাহীন মোমতাজ : লোকঐতিহ্য ও বিজ্ঞানমনস্ক চেতনার সমন্বয় সাধনে পারঙ্গম কবি শাহীন মোমতাজ। তার কবিতার বাক্য সংস্থানে প্রচল শব্দের কৌশলী ব্যবহার প্রতীক-জিজ্ঞাসার সন্ধান দেয় পাঠক মনে। প্রতীকের সহযোগে কবিতায় গল্প বলার প্রবণতাও তার কবিতার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
বীজের ও যাবতীয় চাষ-প্রকৃতির কথা
তুল্যমূল্য হলে
একদিন কৃষিসমাজের কাছে
কিছু দায় জন্ম নিয়েছিল।
এইসব বীজ আর বাণিজ্য বাসনা নিয়ে
ভাবপ্রবণতাহীন,
তার ফলে, ছুটে চলে যাই।
হাটবাজারের কাছাকাছি এলে কোন বীজে
ঘটে যায় প্রাণ-সঞ্চারণ;
সেইসব গুণবতী বীজ আমি
হাতের তালুতে নিয়ে দেখি;
দেখি আর ক্রমে ক্রমে বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে
চাষীসম্প্রদায়।
(বীজ)
আলফ্রেড খোকন : ইমেজ প্রয়োগে জীবনানন্দীয় প্রকরণ নয়; অথচ স্বতন্ত্র একটি ধারা নিয়ে ঐতিহ্য চেতনাপ্রবাহী কবি আলফ্রেড খোকন নব্বই দশকের কণ্ঠস্বর। রোমান্টিকদের মুগ্ধ মায়াবাদী ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা পূর্ণ ন্যারেশন আলফ্রেড খোকনের কবিতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য। তার কবিতা ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ফলে দৃশ্যের সম্মোহনে লিরিক্যাল মূর্ছনা তৈরি করে।
আমরা তবু পাথরের গায়ে জ্বেলেছি আলোর ঘর্ষণ
আর নিঃসঙ্গ মেয়েটির প্রযতেœ লুকানো স্তনের বোটায়
প্রকাশ্যে রেখেছি এক ফোঁটা লালার আগুন,
আগুন উৎসবে জেনেছি
মৃত পৃথিবীর শোভাযাত্রায়ও ছিল কিছু নুড়ি পাথর
কিছু হাড়-গোড়,
টেরাকোটা শিলালিপি
অগ্নিদেবতার
আর আগুন জ্বেলেছিলো গুহার আঁধারে....
(প্রত্মতত্ত্বের ভূমি)
আশিক আকবর : কখনো টানা গদ্যে, কখনো কাটা কাটা বাক্যে ফটোগ্রাফিক ন্যারেশনই আশিক আকবর -এর কবিতার আঙ্গিক। তবে তার কবিতার প্রতিটি অ্যাকটিভ চরিত্রে সে উপস্থিত। অন্যরা সবাই প্যাসিভ। আবেগ আর আপাত যুক্তির স্ফূর্তি নিয়ে আকবর নব্বই দশকের আত্মজৈবনিক কবি।
আমি শিশু।
এক্কেবারে শিশু।
দুগ্ধপোষ্য শিশু।
আনন্দিত শিশু।
শিশু ভালোবাসি।
ভালোবাসি সব।
ভালোবাসি পৃথিবীরে।
পাগলের পৃথিবী।
পৃথিবীতে পাগল আর শিশুরাই জ্ঞানী।
জ্ঞানী শিশু।
ধ্যানী শিশু। ...
(প্রথমের সঙ্গীত)
সিদ্ধার্থ হক : বাক্যে গভীর ব্যঞ্জনার চিত্রময়তা দিয়ে সিদ্ধার্থ হক কবিতা নির্মাণ করেন। তার কবিতায় দৃশ্যের পরিপূরক দার্শনিক উপস্থিত। কিন্তু কোথাও আবেগ আর বুদ্ধি প্রবলভাবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কবিতাকে প্রভাবিত করতে পারে না। এখানেই তার স্বাতন্ত্র্য।
বহুবিধ বাণিজ্যের দিকে চলে গেছে মন
গুচ্ছ পুকুরের জলে চাষ, আমি হয়েছি ঝুলন্ত
তুমি কিন্তু অনিচ্ছায় গুণ্ঠন পড়েছো
ভেবে চৌবাচ্চা ধারণ করে মাছ ও শ্যাওলা।
(ধ্যান)
দাউদ আল হাফিজ : টানা গদ্যধর্মী কবিতা লেখার প্রতিই দাউদ আল হাফিজ -এর ঝোঁক। তার কবিতায় একটি দার্শনিক সত্তার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এছাড়াও তার কবিতায় চিত্রময়তার ভেতর জ্যামিতি আর বিজ্ঞানমনস্কতা নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উপস্থিত।
চক্রাকারে ঘুরছে চাকতি বিরাট বিশাল মহাকাশটুকু
ঘুরছে বিশ্ব বিশ্ব-ব্রহ্মা- ঘুরছে স্বর্গ।
ঘুরছে নরক ঘুরছে মর্ত্য চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারকা
ঘুরছে গ্যালাক্সি শূন্যে শূন্যে সপ্তাকাশ...
শূন্য শূন্যগোলক শূন্যে শূন্যে স্পেস
চক্রাকারে ঘুরছে শূন্যে বিশাল চক্র সুদর্শন।
(আনাবাস)
জ্যাকি ইসলাম : তার কবিতায় বোদলেয়ারের কবিতার মতোই কুৎসিতের ভেতর থেকে ‘সুন্দরের তৃষ্ণা’কে জাগিয়ে ওঠাতে চান। কথোপকথনের বিশিষ্ট রীতি (রফরড়স), এমনকি ংষধহম বা চলতিবুলি, গালাগাল ব্যবহারেও তার নৈপুণ্য দেখা যায়। তার বাক্য গাঁথুনির স্ট্রাকচারও একটু ভিন্ন ধরনের।
পোঁদে তাহার
কিংসাইজ ইমেজের পুষ্টিসাধন
সাধনার পেট মোটা পাতিলের
তলপেট পোষা
রক্ষিতার
বেতার
ভাষণ
(বুড়োর বাগান)
শামীমুল হক শামীম : প্রচলিত অর্থে রোমান্টিক নয়, কিন্তু অন্তর্মুখ ও অনুভূতিপ্রধান হবার ফলে বাস্তব প্রতীকের অনুষঙ্গে যেন এক অধি-রোমান্টিক-আচ্ছন্ন কবিতার চর্চায় মগ্ন শামীম। অনুভূতি দিয়ে কবিতার জগৎ তৈরি করতে গিয়ে শামীমের জন্যে প্রতীকের প্রয়োজনীয়তা হয়ে পড়ে অনিবার্য। তাই তিনি বেছে নিয়েছেন আলোঢেউ, অণু, পরমাণু, বিন্দু, বৃত্ত কোষ ইত্যাদি বিজ্ঞানভিত্তিক ও গাণিতিক প্রতীক। কিন্তু শামীমের কবিতার গভীরে প্রবেশ করতে থাকলেÑক্রমশ প্রতীক ছেড়ে প্রত্যক্ষে অবগাহনের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তার ছায়াম্লান রক্তিম-ধূসর কবিতার জগতে ক্রমশ জেগে ওঠে বাস্তব হৃৎপি-ের রক্তসঞ্চালন।
নিটোল পানিতে সূক্ষ্ম আঘাত পড়লে ছড়ায় আভা ঘূর্ণনে
ক্রমশ বিন্দু থেকেই বৃত্ত হতে হতে সেই বৃত্তাকার ঢেউ
গড়িয়ে গড়িয়ে একসময় হাওয়া হয়ে উড়ে যায় শূন্যে
মগজের কোষে মিলিয়ে যায় জটিল জিনিস বৃত্তের ছন্দে
বৃত্ত হয়ে যায় আবারও বিন্দু তুমি আমি পড়ে রই দ্বন্দ্বে
(বিন্দুবৃত্ত)।
তার এই বিজ্ঞানচেতনা ভিত্তিক প্রতীকী শব্দের ব্যঞ্জনা কবিতার ‘যাবতীয় পরাজাগতিক-ছায়া মত্ত মৈথুনে’ স্পন্দন জাগায়। তাই তিনি অবলীলায় উচ্চারণ করেন:
আনচান মন খোঁজে ফেরে প্রচ্ছায়া লোনা স্বাদ
কোথায় হারালো তাকে গরলে চুমুক দিয়ে
(প্রচ্ছায়া)।
নব্বই দশকের কবিতায় বিজ্ঞান ও প্রেমচেতনার সমন্বয়কের ভূমিকায় তিনি হয়ে ওঠেন স্বতন্ত্র।
জাকির আবু জাফর : সমকালীন প্রসঙ্গ, নগর ও নাগরিক অস্তিত্বের মধ্য দিয়ে কবি জাকির আবু জাফর তার কবিসত্তার বাঙময় প্রকাশ ঘটান তার কবিতায়। দৃষ্টান্ত :
মুখের দৈনিকে পড়ি হৃদয়ের প্রথম সংস্করণ
শেষ ভার্সন চোখের অনলাইনে
দৃষ্টির পোর্টালে পাঠ করি দেহের গণতন্ত্র
দেখি সব অঙ্গ দাবিয়ে হৃদয় তুমুল স্বৈরাচার
সহসা লাইভে হৃদয় সম্প্রচার হলে দেখি-
বিশ্বজুড়ে ফ্রিল্যান্সিং ভোগবাজার
জীবনের ঠোঁট চাটে দুঃসময়ের জিব
দেশে দেশে মানুষের বিরাট মূল্য হ্রাস
ধামাকা অফার শুধু ক্ষমতা সামগ্রীর
(হৃদয়বাড়ি)
সরল ভাষ্য ও চিন্তার গভীরতা দিয়ে জাকির আবু জাফর তার কবিতাকে সাজিয়ে নিয়েছেন, যা নব্বুই দশকের কবিতায় একটি বিশিষ্ট দিক। তার আরেকটি কবিতা লক্ষ্য করা যাক। কি সরল, অথচ গভীর তার ভাবনা:
কেউ কিছু আঁকতে দিলে ফুলই আঁকতাম আমি
ফুল আঁকতে আঁকতে অকস্মাৎ একদিন
এঁকে ফেলি ফুলের গন্ধ
সেই থেকে শুরু আমার আঁকার নতুন তরিকা
তারপর -
রোদ আঁকতে এঁকে ফেলি রোদের উষ্ণতা
ছায়া আঁকতে এঁকে যাই ছায়ার শীতল
দৃশ্য আঁকতে এঁকে ফেলি দৃশ্যের আড়াল এবং
সন্ধ্যা আঁকতে আঁকতে এঁকে রাখি সন্ধ্যার মৌনতা
এভাবেই বৃক্ষ আঁকলে আঁকা হয় বৃক্ষের ধ্যান
(নতুন তরিকা)
তৌফিক জহুর : আধুনিক কবিতায় যুগের প্রয়োজনেই জীবনের কথা ও গল্প উঠে আসতে থাকে। গল্প বলার ভঙ্গিতে কবিতায় মানবিক জীবন ও জীবনের অনুষঙ্গ উপস্থিত। তৌফিক জহুর অসাধারণ প্রক্রিয়ায় এই রীতিকে তার কবিতায় তুলে আনেন। দৃষ্টান্ত:
দুপুর খুলে দেয় ধারাপাত
যৌবনের প্রতি ইঞ্চি জমি পাঠ করি
সবজি ক্ষেতে বপন করি বীজ
রোদের রশ্মি ট্রেনের হুইসেল বাজিয়ে
জানালার কার্ণিশে ঘুমিয়ে যায়
বিকেল আসে সারা শরীরে আতর মেখে
গোধূলির সুবাস ছড়িয়ে দেয় চারপাশ
আমাকে আহবান করে পর্বতশৃঙ্গ
আমি তুলার পাহাড়ে কিসমিস খুঁজি
ঝরনার আয়না জলে
ঠোঁট ডুবিয়ে পান করতে থাকি বিশুদ্ধ জল।
একদিন ঝরনায় নেমে মাছ হয়ে যাই।
(দুপুর)
কবিতায় প্রকৃতিলগ্ন জাদুবাস্তবতার একটা অনন্য লক্ষণ তার কবিতায় লক্ষণীয়। এটি তার কবিসত্তার স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
বীরেন মুখার্জী : বীরেন মুখার্জী কবিতায় ঐতিহ্য ও ইতিহাস চেতনাকে আশ্রয় করে আধুনিক কবিতার বর্ণনাধর্মী রীতিকে ব্যবহার করেন, একদম তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায়। লক্ষণীয় :
অনুপম সেই সন্ধ্যা, ওরা ভেবেছিল- অন্ধ আমি; তাদের চৌকষদল আমার গোত্র খুঁজে পায়নি। নামকরণেও ব্যর্থ হয়েছিল রাজপুরোহিত, আর, তাদের পাশে দাঁড়িয়েও নির্বিকার আমি, শুনছি- দূরে কোথাও ঘোষিত হচ্ছে তুমুল রাত্রিকথা!
এভাবেই লেখা হলো রাত্রিনামা- উপসর্গের আড়ালে!
আড়চোখে গোধূলি এঁকে ফিরে গেলে- বিদগ্ধ সারস, ভেবেছি বহুদিন- বিমর্ষ যে সন্ধ্যায় জন্ম হয়েছিল আপাত সত্যের, সেখানেও কি গোপনে লেখা ছিল অন্ধতার কাহিনি? সভ্যতা সেঁচেও দেখেছি, চোখ থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ অন্ধ অজগর। সুতরাং অনুপম সন্ধ্যায় ভাবনার আসমানে উড়ে যেতে দোষ নেই-"
(রাত্রিনামা)
তার কবিতায় কথার চিত্রমালা নির্মাণের পাশাপাশি জীবনবোধের দর্শন অনুসন্ধানের মনন লক্ষ্য করা যায়। দৃষ্টান্ত :
যে ভাবেই দেখো- জীবন এক প্ররোচনাময় টগবগ, কতিপয় ঘোরেই সুস্থির!
বরং অননুমোদিত সেইসব দিনের কথা ভেবে হেঁটে যাও প্রাগ্রসর পথে, হয়তো শুনতে পাবে- পর্যটনপ্রিয় ঘোড়াদের হ্রেষাধ্বনি মিলিয়ে যাচ্ছে শ্রাবণভূমির অচেনা সন্ধ্যায়, বুঝে নিও- অশ্রু ও বর্ষার শাশ্বতরূপে প্রোথিত রয়েছে রূপান্তরের বিপুল সম্ভার। কিংবা, ঊরুস্তম্ভে উল্কি এঁকে বিকল্প উৎসেও খুঁজে পেতে পারো জীবনের প্রকৃত নৈর্ঋত!
এভাবেই- হাঁটতে হাঁটতে ভেঙে ফেলো অরের শব আর কাচের মহিমা; প্ররোচনা এড়িয়ে- ভাবে ও আচারে পুনরাধুনিক হয়ে ওঠাই বরং শ্রেয়তর!"
(জীবনমুদ্রা)
মিলু শামস : প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানবিক বিপর্যয়ের সংকট-মুখর এই সময়ে চেতনাকে একটু যেন ধাক্কা দেয় মিলু শামসের কবিতা। শ্রেণীসংগ্রামের আটপৌরে শ্লোাগান থেকে বেরিয়ে তিনি নিবিড় বীক্ষায় মার্ক্সসীয় দর্শনকে খুব সহজেই কবিতায় তুলে আনেন। সহজ ভাষা আর গল্পের ছলে কী অসাধারণ মুন্সীয়ানায় কবিতার আধার ও আধেয় সাজান তিনি। দৃষ্টান্ত:
শহরের মাঝ বরাবর
লাল ইটের হেরিংবন্ড রাস্তার দু’ধারে
একদা আবাস ছিল সবুজ তৃণের
ফুল ফল জন্ম দিয়ে যারা
প্রকৃতির বুকে নিজেদের মতো বেড়ে
প্রাকৃতিক নিয়মে যেত ঝরে।
তাদের আব্দার ছিল না কোনো
মাটির কাছের
ফুল ফলকে আরেকটু নির্যাস দিয়ে
বেড়ে তোলার,
আকাশের কাছের
নীল সাদা মেঘ ছোঁয়ার,
বাতাসের কাছের
শুদ্ধ অক্সিজেন পাওয়ার,
চাওয়ার ছিল না কিছুই;
কেননা যে জীবন করছিল তারা যাপন
তাকেই ভেবে নিয়েছিল শাশ্বত, চিরন্তন।
একদিন শক্তপোক্ত
অশত্থ গাছ এক জন্মায় সেখানে
হাঁক দিয়ে বলে, শোনহে তৃণ দল
তোমাদেরও আছে অশ্বত্থ হওয়ার অধিকার
পরিপুষ্ট ফুল ও ফসল ভরা
সংসার পাতার।
সেই প্রথম চমকায় তারা
খাড়া হয় শিরদাঁড়া
হেরিংবন্ডের লাল ইটের রাস্তায়
হেঁটে যায় পায়ে পায়;
রক্ত জবার নির্যাস মাখা রেড ওয়াইনের গ্লাস
অভিনব কৌশলে এনে দেয় আত্মবিশ্বাস।
অশত্থের কথা ফলে অক্ষরে অক্ষরে
ফুল ফলে সংসার যায় ভরে।
(.... )
এখন সড়ক চলে গেছে হাইওয়ে বরাবর
জ্ঞানপ্রাপ্ত তৃণরা মিইয়ে গেছে এবার
আশার আঁকশী ধরে টিকে আছে কোন মতে
একদিন পূবাকাশ ভরে যাবে
টকটকে লাল সূর্যের অবয়বে।"
(সূর্যের অপেক্ষায়)
মামুন মুস্তাফা : মামুন মুস্তাফার কবিতা মননদীপ্ত চেতনায় শানিত। ঐতিহ্য, জীবন আর জীবনসংগ্রামের মননশীল ভাষ্য তার কবিতার উপরিতলে অবস্থান করলেও, গভীর তলে সমাজবাস্তবতার দার্শনিক মনন ক্রিয়াশীল। এখানেই তিনি অনন্য। দৃষ্টান্ত :
ঢোল বাজানোর হাড়’ গুণে গুণে এগিয়ে গেছে ঢুলী। ঢোলের প্রতিটি আঘাতের ভেতরে জেগে থাকে বাণিজ্যের স্বাদ। ঢুলীর জীবন যেন মায়াময়, ক্যামেরাবন্দী সে আয়ুষ্কাল। তবু সমস্ত মাড়িয়ে যাচ্ছে এক ছদ্মবেশী ঋণ, ঢুলীও ক্রমশ দিগন্ত রেখা পার হয়ে যায়। ঢোলকের বাজনার ভেতরে দুপুরের বৈবাহিকতা ফিরে পায় শ্মশানের অস্তিত্ব। সকালের বিরল হাওয়া ঢেকে দেয় ঢুলীর পরম্পরা জীবন- সফল বাণিজ্যের অস্থি খেলা করে তার বাদামকাঠের গাঢ় কফিনের কাছে
(কফিনকাব্য: এগার)
কামরুল বাহার আরিফ : নব্বই দশকের কবিতা বিচিত্র ধরন আর বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। অনেক সৃজনশীল কবির আত্মমগ্ন চৈতন্যের প্রযত্ন ও প্রয়াসে এই দশকের কবিতা বৈভবে অনন্য। সেই নিরিখে কামরুল বাহার আরিফ নব্বুই দশকের কবিতায় সম্বিৎ ও মানবিক চেতনাকে পরিস্ফুট করেছেন। খুব অল্প কথাতেই গভীর তাৎপর্য তুলে ধরেন কবিতায়। দৃষ্টান্ত :
বালিকারা কুকুর দেখতে দেখতে নারী হয়
অতঃপর সেই নারী হায়েনাকে করে জয়।"
(টুকরো কাব্য)
তার কবিতায় কথা, গল্প আর নাট্যরীতির শিল্পচেতনা লক্ষণীয়। কবিতায় গল্পে গল্পে আমাদের মানবিক চেতনাকে বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেন তিনি। দৃষ্টান্ত :
স্বপ্নে দেখলাম আমার সমস্ত গ্লানি আর ব্যর্থতার কাছে
পরাজিত হয়ে আমি আত্মহত্যা করেছি
আমাকে ঘিরে ঘরভরতি মানুষ
কেউ বিলাপ করছে অথচ তাদের বিলাপ করার কথা নয়
কেউ আফসোস করছে সামান্য বন্ধুত্বের জন্য
কেউ কেউ দুঃখ প্রকাশ করছে, ‘এমন করে যেতে হবে!’
মৃত মানুষের সামনে গালমন্দ করা শোভন নয় বলে
কেউ কেউ মনে মনে সমানে গালি দিচ্ছে
মৃত্যুর কারণ খুঁজতে থাকা রহস্যঘেরা কিছু মানুষ
ভীষণ তীক্ষ্মচোখে আমাকে পরখ করছে।
(...)
স্বপ্নের ভিতরে স্বপ্নের একটা শিরোনামও দিয়েছিলাম,
‘ব্যর্থতা ও গ্লানির আত্মকাহিনি’র তবু মৃত্যু! মৃত্যুই তো!
(অনিবার্য নিয়তির সাক্ষাতে)
পাবলো শাহি : নব্বুই দশকের কবিতায় ইতিহাস, ঐতিহ্য, পুরাণ ও বিজ্ঞান চেতনা নিয়ে যে কবিরা তাদের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নির্মাণে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, তাদের মধ্যে পাবলো শাহি অন্যতম। কবিতায় বুদ্ধিবাদী চেতনাকে যে নির্ভারভাবে প্রয়োগ করা যায়, তার উদাহরণ পাবলো শাহির কবিতা। দৃষ্টান্ত:
মৃত্যুকে পাঁজাকোলা করে ভীড় ও সভ্যতার মধ্যে ছুঁড়ে দেবো
আমি। দেখবো জীবাস্ম থেকে, জীবনের ধোঁয়া থেকে করোটির
ব্যাকরণ থেকে কীভাবে বুড়ো সূর্যটা ভালোবাসার নামে মৃত্যুকে
ভয় দেখায়। তখন দেখবো, আমার গায়ের নশ্বর গন্ধ কীভাবে
অদ্ভুত গলায় ভয়ের কথা বলে। আজ যারা পৃথিবী নামক
গোলাপ কুড়ানো রাক্ষসীর কাছে জমা দেয় ফিঙেও
পতঙ্গের লীলা, তাদেরকে আমি বলি- আমি রাধা ও কৃষ্ণের
যুগলবন্দি। কেননা আমি কাশবনে কুড়িয়ে পাই- মেঘের ডাক,
সবুজ বেড়ালের চোখ ও হারিয়ে যাওয়া মরালগ্রীবা আর জানি
এ পৃথিবীতে মৃত্যু মানে দুই চোখে ফোটা লক্ষ বছর, টবে ঝরে
যাওয়া ফুল অথবা ভালোবাসা। আমি তাই মৃত্যুকে পাঁজাকোলা
করে ছুঁড়ে দেই ফুল ও পতঙ্গের মাঝে, সরোদ বাদকের
আঙুলের ডগায়।
(সরোদ বাদক)
আত্ম-উপলব্ধির জগৎ যে নির্ভার সৌন্দর্য আর গানিতিক যুক্তিকে ভেঙ্গে মানবিক যুক্তি ও সৌন্দর্যের প্যারাডাইম তৈরি করতে পারে,তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ পাবলো শাহির কবিতা।
৩.
একথা বলার অপেক্ষা রাখে না, নব্বই দশকের ক্ষেত্রে একযোগে এগিয়ে এসেছেন একদল প্রতিভাদীপ্ত তরুণ প্রাণময় কবি। এই কবিদের সংখ্যা অনেক। এদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আরো কিছু কবি হচ্ছেন: মিজান খন্দকার, রণক মুহম্মদ রফিক, মারজুক রাসেল, তাপস গায়েন, মারুফুল আলম, শাহীন শওকত, জহির হাসান, খলিল মজিদ, মাসুদ মুস্তাফিজ, মাতিয়ার রাফায়েল, সাজেদুল ইসলাম, সাদি তাইফ, মাহবুব পিয়াল, শিবলি সাদিক, মিহির মুসাকী, জেনিস মাহমুন, রোকসানা আফরীন, সৌমিত্র দেব, সৈকত হাবিব, লীসা অতন্দ্রীলা, পুলক পাল, মোজাম্মেল মাহমুদ, ফাহিম ফিরোজ, কবির মনি, মশিউর রহমান খান, মাসুম মোকাররম, অদিতি ফাল্গুনী, রওশন ঝুনু, হামিদ রায়হান, মামুন মিজান, আবু আহসান, ইমরুল হাসান, আকরাম খান, আমিনুল বারী শুভ্র, হাদিউল ইসলাম, রবিন আহসান, মোহাম্মদ আমজাদ আলী, সামীস আরা, শামীম শওকত প্রমুখ।
এইসব কবিদের নিয়েই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশর নব্বই দশকের কবিতার বিশ্ব। এ বিশ্বে তারা নির্মাণ করেছেন আত্মোপলব্ধির কবিতা। তাদের কবিতায় উঠে আসছে বাংলার নিজস্ব মৃত্তিকা, জল ও আবহাওয়ার ধর্ম-দর্শন-ঐতিহ্য, অতীত ও ভবিষ্যতের প্রণোদনার সঙ্গে বৈশ্বিক-চেতনা, শ্রমশিল্পের সংগ্রামিতা ও মহানাগরিক আত্মা ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় চেতনার উৎকর্ষ সংশ্লিষ্ঠতা। নব্বইয়ের কবিতা এগিয়ে গেছে ভাষা-শৈলী-ছন্দ-চিত্র-স্থাপত্য-চেতনার বৌদ্ধিক প্রজ্ঞায় ও সরলতায়।


ড
ReplyDelete