লালমিয়া মোল্লা
লালমিয়া মোল্লা
জন্ম:- ১৩৭০ বঙ্গাব্দের ৬ ফাল্গুন। গ্রাম - বাড়জুলি, থানা - ভাঙড়, জেলা - দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা। শিক্ষা :একাদশ শ্রেণি।ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসাবে গণশক্তিতে কিছুদিন লেখালেখি।১৯৯৩ সালে দৈনিক ওভারল্যান্ড সংবাদপত্রে চাকরি গ্রহণ।বর্তমানে ভাঙড় মহাবিদ্যালয়ে কোষাধ্যক্ষ হিসাবে কর্মরত।সম্প্রতি নিখিল ভারত শিশু-সাহিত্য সংসদের সদস্য হিসেবে সার্ক কালচারাল সোসাইটি ও উত্তর কালিগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমির আহ্বানে বাংলাদেশের একটি সাহিত্যসভায় অংশগ্রহণ করে এসেছেন।বাংলাদেশ সহ এপার বাংলার সমসাময়িক বহু ছোট-বড় পত্র-পত্রিকাগুলিতে লেখা প্রকাশিত হয়েছে।
নাটক : ১৯৯১ সালে সাক্ষরতা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে লেখা দুটি নাটক 'চল যাই নয়া পাঠশালায়' ও 'আলোয় ফেরা' ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের বিভিন্ন শাখা কর্তৃক দীর্ঘদিন অভিনীত হয়। তাঁর লেখা কাহিনী অবলম্বনে নাটক 'তালাক' আকাশবাণীর বিবিধ ভারতী কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়। উপন্যাস : 'ঝড়-বৃষ্টি-রোদের হাসি'।
সম্পাদিত পত্রিকা : সমকাল, সূর্যমুখী, সময়ের কলম (পাক্ষিক সংবাদপত্র), রাহিলা (আবদুর রব খানের সঙ্গে সহকারী সম্পাদক হিসাবে কয়েকটি সংখ্যা)।
প্রকাশিত বই :প্রথম চিঠি (কবিতা) - ১৯৮৪,ঝিনুক (কবিতা) - ২০০৩।
গুচ্ছ কবিতায়
কবি লালমিয়া মোল্লা
ফোসিল
আজ সকালবেলায় কিছুটা মাটি খুঁড়েছি-- একটা ঢিবির।
এর তলায় সযত্নে আমার ফোসিল রাখা ছিল কচিবেলাকার।
খুব বেশি নয়, বছর পঞ্চাশ আগের--
একটা ফুটফুটে বাবুমূর্তির পাশে সাজিয়ে রেখেছি
আমার জন্য বড়-বাড়ি থেকে আঁচলে পান্তা চেয়ে আনা ঠামমা,
তার পাশে একটা পাটশাক-তোলা-মা আমার,
এলাকার সর্বশ্রেষ্ঠ বিড়ি-শিল্পী জোয়ান বাপ,
একটা আত্মীয়-গন্ধ-গোবর লেপা মাটির দাওয়া,
ঠাম-মার হাতের খেজুর পাতার ছেঁড়া চাটাই,
পোঠেতে বসানো একটা কাঁসার বদনা,
রান্না ঘরে চন্ডী পালের হাতে তৈরি মাটির হাঁড়ি,
আর আইআরএইট চালের ভাতের গন্ধ পাওয়া দৈবাৎ উৎসব।
ভাঁঙা টিনের ট্রাঙ্কে মা-গন্ধ একটা হলুদ রেশমি শাড়ি,
ঠাম-মার হাতের একগাছা রুপোর চুড়ি,
একটা বিবর্ণ কাপড়ে মোড়া ভিটের দলিল।
পাটশাক সেদ্দ কোঁচড়ে আমার চাচাতো বোন সুকিলা--
তার হাতের নুন দিয়ে সেদ্দ করা পাটশাক কী ভালো লাগতো!
আর রেখে ছিলাম সহরজান ফুপুর নদী উপুড় করা স্নেহ,
তার বাড়ির পাশের বিদ্যাধরী নদীর জলের ঝিকিমিকি হাসি,
যার স্রোতে একটা কলার মোচার খোসায় ভাসিয়ে দিয়েছিলাম
আমার এলেবেলে কৈশোর।
এইসব যত্ন করে রাখা আছে এইখানে উঁচু ঢিবিটার নিচে।
মুঠো-মুঠো মাটি দিয়ে সময়ের মশলায় গেঁথে
তৈরি করেছি এই পিরামিড--
যার ভেতরে মমি হয়ে আছে আমার হিরণ্য শৈশব।
জন্মদিন
নীরবতা ভেঙে গেলে যে কথাটা দিয়ে কথা ফোটে--
সে কথা আগুন-কথা চরাচর জ্বলে পুড়ে যায়।
সত্যিটা পড়ে যদি হাট-মাঝে তপ্ত কড়ায়,
যদিও লোহার কড়া তবুও সে ছ্যাঁক করে ওঠে।
সে কারণে অবরুদ্ধ দরদি এ কণ্ঠ কবির:
নির্বাক কবি তাই লিখে যায় তার এপিটাফ--
বুকে তার জমে যায় অসুস্থ সময় সন্তাপ,
কথারা পাথর হয় কবি হয় পাথর স্থবির।
এমনই সময় ফোটে মধু-গন্ধ দ্যুতিময় ফুল--
বারুদ-গন্ধ তার সৌরভে হয়েছে মলিন।
ইত্যবসরে কবি তবে কি সে নয় বন্ধুহীন,
পাথরও তো কথা বলে ইতিহাস হয় বিলকুল।
নরকনন্দিনী তাই নাম রাখি তার নার্গিস:
একটি বন্যফুল কবির সে বিশল্যকরণী,
বনলতা ছুঁয়ে দিলে পাথরও ঝরায় নির্ঝরিনী--
কবি তো নীলকণ্ঠপাখি-- অনন্ত ও অহর্নিশ।
অসুখেরও নিশ্চয়ই লিপিবদ্ধ থাকে জন্মদিন:
অসুস্থ সময় তারও থাকে শুরুর গল্পটা;
প্রিয় ফুল তারও থাকে দিনক্ষণ, ফুল হয়ে ফোটা--
প্রিয়তম বন্ধু হলে লিপিবদ্ধ থাকে শুভ দিন।
লক ডাউন
এসো হে প্রগাঢ় নিঃঝুম। অসুস্থ সময় থেমে যাও।
প্রদূষিত বাতাসের ঘুম-ঘুম নিস্তব্ধতাও--
সুস্বাগতম। বুকের গভীরে এই পীড়া--
স্তব্ধ করো বংশবিস্তারী জীবানুর স্বেত যৌনক্রীড়া।
হে প্রিয় নিরবতা, হে মৌনী হিমালয়
তুমিই অজস্র কথা, কবিতা, জীবনের ধারাপাতে
কল্লোল তুলে বাঙ্ময়।


Comments
Post a Comment