আয়শা ঝর্ণা



আয়শা ঝর্না 
নব্বই দশকের কবি। বেশ ছোটবেলা থেকে লেখালেখির শুরু। উনিশ বছর বয়স থেকেই। আগুন ঝরা বাম রাজনীতি আর লিটলম্যাগে লেখার ভেতর দিয়ে তার উঠে আসা। প্রথম কবিতার বই 'আঁধার যান' ১৯৯৬ সালে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয়।কবিতায় এক্সপেরিমেন্ট কবির পছন্দ।কাব্যগ্রন্থ:- মাত্রমানুষ, উনুনের গান, আয়না রক্ত হল্লা, বাতাস তাড়িত শব্দ গল্পগ্রন্থ : চারকোল ২০০৮। প্রবন্ধ :-২০১৩। অনুবাদগ্রন্থ: সিলভিয়া প্লাথের এরিয়েল,নারীস্বর (বিশ্বের নারী কবিদের কবিতা) ২০১৪। সি পি কাভাফির কবিতা ২০১৭।



গুচ্ছ কবিতায়

কবি আয়শা ঝর্না




শীত


শীতকাল এসেই জানাবে

ঝরাপাতা কুড়ানো কুহক

হিম হিম সন্ধ্যা একরাশ

শিশিরের মুক্তাঝরা ভোর

কবেকার কুহক জাগানো ঘোর!

দীর্ঘদিন শেষে দীর্ঘ রাত

যেন দুঃস্বপ্ন দেখছি।

একটা একটা দিন যায়

গোটা সপ্তাহ বছর

ধরো পুরো জীবন এভাবে

গেল চলে ঘন মর্মরের গুঞ্জরন।

আহত পাখির পালকে শিশির দানা

চোখে তার রক্ত হিমঝরা নিস্তব্ধতা,

মুখে অলৌকিক জন্ম অরূপের ভার।



উৎসব


স্তব্ধ আর বোবা হয়ে গেছি

কেটে ফেলা হয়েছে আমার জিভ

যোনি আজ শকুনেরা ছিড়েখুঁড়ে নেয়,

স্তন নখ আর দাঁতের আঘাতে

ছিন্নভিন্ন, চোখ খুবলে নিয়েছে।


আমাকে পোড়ানো হয়েছে হাতরসে

আমাকে নগ্ন করেছে বেগমগঞ্জে,

আমার যোনিদ্বার ওদের

মাতৃজঠরের উৎসবগুহা।

আমার শরীর আজ এক ভাগাড়

এমসি কলেজে আমার শরীর ঘিরে

লিংগ, ক্ষমতার মহোৎসব চলছে,

আমার জিভ, যোনি আজ রাষ্ট্রের

ভাগাড়, এ রাষ্ট্র মৃত, এ দেশ আমার

নয়, এই দেশ জমিন লিংগের, ক্ষমতার।


আমার যোনি, স্তন, জিহবা, শরীর আজ

জ্বলছে রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রে, সীমানা

পার হয়ে আমার চিৎকার,

আমার কাটা জিহবা, খনার জিহবা।

খুবলানো চোখ তোদের চোখের ভেতর

আগুন জ্বালাবে..

মেয়ের দিকে তাকাতে পারবি না

মায়ের জঠরে যেন তোদের জন্ম

না হয়, তোরা তোদের লিংগকে

ক্ষমতায় বসিয়ে চাটতে থাক,

পেট্রোলে পোড়া, দেখ কেমন দাউ দাউ

জ্বলছে চিতা, চিৎকার করে বাবা, ভাই প্রেমিক

কাউকে আর ডাকবো না রাষ্ট্র, তোর লিংগ

তুই কেটে নে, তোর চোখ তুই পুড়িয়ে দে।

তোর জন্ম দেবে না কোন নারী যোনি,

মনে রাখিস রাষ্ট্র হাতরসের চিতা বেগমগঞ্জে,

নারী থেকে নারীর শরীরে পুড়ছে দাউ দাউ।


থেতলে যওয়া স্বপ্ন


সবকিছু, সব দায়িত্ব শেষে

নিজের জীবন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি

কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে,

ভাবছি কেমন বাজেভাবে কেটে গেল

একটা জীবন একটা শৈশব, সব।


কখনো কখনো কারো কাছে

বলিনি কেমন বিষন্নতা ভর করে

ছিল দুপুরের কড়কড়ে রোদে মেঘে।

এখন যখন এসে দেখছি গলির মুখে

শ্যাওলার ঝোপঝাড় অচেনা মানুষ

আর ঐ যে হেঁটেচলা পঁচিশ ছাব্বিশ,

ওর হাত ধরে বলি, চলো জীবন বদলে নেই।

আমার নদীর সাথে বসফরাসের

নীল জল আর বুড়িগঙ্গা!

অদ্ভুত বিষন্ন রাত, আমি তবু তাকে

বলি ইস্তাম্বুল এক স্বপ্ন আমি যেতে

পারি নাও যেতে পারি, অচেনা পথিক হয়ে

ঘুরে বেড়াতে চেয়েছি, চেয়েছি আমার

জীবন আমার হাতে দুমড়ে মুচড়ে

ফেলে দিতে, কিন্তু দেখো বসে আছি

এইসব সমস্যার ভেতর যেখানে

মাছ ডাল পেয়াজ রসুন ডাল

কিসব সবুজ ঘাসের ঘ্রাণ!


আমি পালাতে চেয়েছি

আর তখনি বন্দুক তাক করে

আমাকে এনকাউন্টারে দেয়া হলো

আমার স্বপ্নের পাখিগুলো

ডানামুড়ে পড়ে আছে মর্গে

মায়ের চোখের মণি কাঁপে তির তির।


আমি মরে গেছি টেকনাফে, গুলি

আমার স্বপ্নগুলোকে এফোঁড় ওফোঁড় করে

চলে গেছে, আমি উড়তে চেয়েছি

জীবনের রঙ দেখো, লাল লাল রক্ত,

বিষপিঁপড়ে খেয়ে নেয় চোখ,

আমি পড়ে আছি স্বপ্ন নিয়ে

টেকনাফে শ্যামলা পয়েন্টে!


আমার জীবন গুলিবিদ্ধ

এক সমাজের কাছে,

রাষ্ট্রের জীম্মায় জিম্মি।

কিভাবে মানুষ থেকে

লাশ হয়ে গেলাম আমরা

তার খোঁজে বেরুলে দেখবে

নীল সমুদ্রের আর্তনাদ

এক নাগাড়ে আছড়ে পড়ে তীরে।

 

Comments

Popular posts from this blog

কামাল আহসান

সুচিপত্র

মিহির সরকার