শান্তা মারিয়া
শান্তা মারিয়া
জন্ম:- ২৪ এপ্রিল, ১৯৭০ ঢাকায়। বর্তমানে চীনের ইউনুনান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিন বছর বয়স থেকে মুখে মুখে কবিতা লেখা শুরু। নয় বছর বয়সে প্রথম কিশোরকবিতার বই 'মাধ্যাকর্ষণ' প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে। দৈনিক মুক্তকন্ঠ-এ সাংবাদিকতা জীবন দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু। এরপর জনকণ্ঠ পত্রিকায় 'অপরাজিতা' পাতার বিভাগীয় সম্পাদক ছিলেন। তাছাড়া 'আমাদের সময়' পত্রিকার অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর, রেডিও আমার-এর নিউজ এডিটর এবং চীন আন্তর্জাতিক বেতার কেন্দ্রে বিদেশি বিশেষজ্ঞ সাংবাদিক হিসাবে কাজ করেছেন। গল্প, ভ্রমণ কাহিনী লেখায় তিনি সিদ্ধহস্ত। তিনি ভালোবাসেন মিথলজি ও ইতিহাস পাঠ কবি শান্তা মারিয়ার প্রিয় শখ।
কালো নারীর কাব্য
আমি কালো
নিকষ আঁধার দূর্বা ঘন তমালবরণ।
আমার শরীরে কোন আর্য রক্ত নেই।
সহজসাধক, চর্যানারী আমি
শ্যামাকন্যা স্মরণ করিনি কোন আরব পুরুষ।
আমি কালী, রণচন্ডী, বিশালাক্ষী
এলোকেশী শ্যামল কুমারী
কালো রং আমার গৌরব
স্পর্শ করিনি কোন মগ দস্যু, বর্বর, হার্মাদ
বর্গী, ঠগী, মোগল, পাঠান, নীলকর, শ্বেতাঙ্গ পুরুষ
আমার প্রেমিক নয়।
মাতঙ্গিনী ভূমিকন্যা আমি
কৈবর্ত, কৃষক, মালো, অনার্যপুরুষ কন্ঠে
বরমাল্য করেছি স্থাপন।
সিঁদুর, নূপুর, শাড়িতে, শাঁখায়
প্রদীপ্ত উজ্জ্বল শ্যামল মাটির প্রেম
ঝড়ের মেঘের সাথে আমার আলাপ
আমি কালো শ্যামবর্ণা, পললজননী।
চন্দ্রকোট, সোমপুর, পুন্ড্রধাম ময়নামতির প্রাচীন বেদীতে
জ্বলে আমার আরতি, অর্ঘ্যশিখা স্তূপপদমূলে
দেবভাষা, বেদগ্রন্থ, কিতাব পড়িনি
প্রাকৃত রমণী আমি।
সীতা, সতী, সাবিত্রী কখনো নয়,
বেহুলা, ফুল্লরা, শ্যামলী আমার নাম
লখীন্দর, কালকেতু আমার প্রেমিক।
মাদলের ধ্বনি নাচে রক্তের প্রবাহে
চড়কে, বৈশাখে, দোলযাত্রা, রাস পূর্ণিমায়
অঘ্রান পার্বণে প্রাণের গভীরে বাজে
আদিম ফসলি গীত, হাতে জ্বলে লক্ষীর প্রদীপ।
আমি মহুয়া, মহুয়া, চন্দ্রাবতী, ভেলুয়া সুন্দরী
আদিম বাঙালি নারী
রাঢ়,বঙ্গ,হরিকেল,গৌড় সমতটে
শঙ্খপার নদীর কিনারে
অনন্ত জনম ধরে বসতি করেছি
অনার্য কোজাগরী
বাংলার আকাশ জুড়ে বহমান কোজাগরী রাত
শিকড়ের গান গায় ভেজা মাটি বকের পালক
কুমারীর হাতে জলে কবেকার লক্ষীর প্রদীপ
স্তোত্র পাঠ মুখরিত আশ্বিনের প্রাচীন পূর্ণিমা।
রক্তের ভিতর ওড়ে দুধ সাদা প্যাঁচার শাবক
ধূপের সুবাসে ভাসে শিশিরের নিভৃত আলাপ।
ছাতিম ফুলের ঘ্রাণ অন্ধকারে ঘন হয় আরো
মাটির গভীর স্রোতে কান পেতে শোনা যাক এসো
জলের বাতাসী গান, ফসলের আদিম ইশারা।
অপরূপ খোলা চুল, সাদা শাঁখা, রক্তিম সিঁদুর
প্রবারণা জেগে থাক প্রেমিকের উদাসীন চোখে
কোজাগরী, কোজাগরী, বরমাল্য কার হাতে বলো
রুপালি ফানুস উড়ে সুপ্রাচীন লক্ষ্মীর অন্তরে
অনার্য আকাশে আজ নিজস্ব নক্ষত্র জ্বলে
কমলে কামিনী হাসে শঙ্খপাড় নদীর প্রবাহে
অন্ধকারে ভেসে যায় আকাঙ্ক্ষার মাটির প্রদীপ।
ওম মণি পদ্মে হুম
তারপর কোশলের প্রাচীন সড়কে
রাত্রি নেমে এলো
আরতির প্রদীপ আর ধূপের ধোঁয়া
মিলিয়ে এলো শিশিরের জলজ সৌরভে।
বিষ্ণু মন্দিরের দেবদাসীরা
কামজ লীলা শেষে
আঁচলে বেঁধে নিল প্রগাঢ় রাত্রিকে।
নগর নটির উচ্ছল নূপুর
ক্লান্ত হতে হতে
আকাশের দেহে উৎকীর্ণ করে চলে
বাসনার ক্ষীণ ক্যাসিওপিয়া।
ঘুমন্ত কপিলাবস্তুর উদ্যান প্রাসাদে
শাক্য কুমার
জীবনের অনিঃশেষ ক্লান্তিতে বিপর্যস্ত
তবে কি যযাতি ঠিক?
বাসনার রক্তবীজ
দেহকে উত্তাল করে
যে দেহ কীটের খাদ্য
সে দেহের অলিতে গলিতে
কন্দর্পের অক্ষয় রাজ্যপাট।
তক্ষশীলা থেকে গান্ধার মিথিলা
আকণ্ঠ নিমগ্ন কেন মৃগয়া মৈথুনে
সুপ্রাচীন আর্যভূমি জুড়ে
চার্বাকের অট্টহাসি
ভয়ংকর প্রতিধ্বনি তোলে
যশোধরা অথবা রাহুল
চেতনার স্তরে স্তরে নতুন পলল
গৌতম হেঁটে যান।
তার পদশব্দে
আড়মোড়া ভাঙে যাবতীয় মোহান্ধ অসুর।
কাঁচ ভাঙার শব্দে ভেঙে পড়ে
বৈশালী, শ্রাবস্তী, বারাণসী,লিচ্ছবি নগর
বুদ্ধং শরনং গচ্ছামি
সংঘং শরনং গচ্ছামি
পথ শুধু পথ
অন্তহীন প্রবাহন
শ্রাবস্তীর জেতবনে উচ্চারিত অলঙ্ঘ্য বিধান
শ্রেষ্ঠী, নৃপতি, ক্ষত্রপ বনিতা
স্বয়ম্ভুর স্তূপে জ্বলে অমোঘ প্রদীপ
মহা উচ্চতায় মাথা হেঁট করে
অন্নপূর্ণা, কাঞ্চনজঙ্ঘা, সাগরমাতা
তীব্র শিখায় বিস্ময়ে বিমুগ্ধ দূরবর্তী কাল।
সিদ্ধার্থ দুই চোখ করুণায়
অবিরল নিম্নমুখী।
ব্যাধি জরা মৃত্যু ধ্বংস
তবুও নির্ভাণ নয়
বড় বেশি আকাঙ্ক্ষিত মানবজীবন
অবন্তিকা মালবিকা বাসবদত্তা
এখনও উত্তাল
বাজে প্রলয় নিক্কণ।
আমাদের নিভৃত রক্তকণিকায়
বাৎসায়ন জয়ধ্বনি তোলে
যশং দেহি ধনং দেহি
হোমাগ্নি আচ্ছন্ন আকাশ।
তুষিত স্বর্গ ছেড়ে আর একবার যদি
বোধিসত্ত্ব দিয়ে যায় অবারিত প্রেম
অনিঃশেষ আর্যভূমি
কুমার মৈত্রেয়
বোধিদ্রুমের প্রাচীন শিকড়
আরেকবার উচ্চারিত হোক
ওম মণি পদ্মে হুম।


Comments
Post a Comment