জুনান নাশিত
জুনান নাশিত
জন্ম:- কুমিল্লা।নব্বই দশকের মাঝামাঝিতে তার আত্মপ্রকাশ।লেখালেখির শুরু স্কুল জীবনে।মূলত কবিতা লিখলেও প্রবন্ধেও সমান আগ্রহ। বেরিয়েছে একাধিক প্রবন্ধ এবং সম্পদিত গ্রন্থ। এছাড়া ছোটদের জন্যেও লিখেছেন ছড়া, গল্প ও উপন্যাস। তার মোট গ্রন্থসংখ্যা ১৫।
জুনান আত্মলিপ্ত। একইসঙ্গে সমাজ, সংসার ও সময়ের বাস্তবতাতেও আত্মলীন।তিনি অর্থনীতি নিয়ে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন।পেশায় সাংবাদিক কবি জুনান নাশিত জাতীয় বার্তা সংস্থা বাংলাদেশে সংবাদ সংস্থায় কাজ করছেন। এর আগে কাজ করেছেন দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক ইত্তেফাক ও এটিএন বাংলার বার্তা বিভাগে।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:-কুমারী পাথর,অন্য আলো অনেক দূরের,পলকাটা অন্ধকার,বাতাসে মৃত্যুর মায়া,কাঁটাঘন চাঁদ,জলন্ত ভ্রূণ, বেইলি রোডে বাল্মীকি।
সম্পাদিত গ্রন্থ:আবুল হোসেন: কবির পোর্ট্রেট, প্রবন্ধ: রবীন্দ্রনাথ:রোগশয্যায়,দুই বাংলার কথা ও কাব্য। শিশুতোষ: ব্যাটে বলে ছক্কা, হরেকরকমবা, বেগুনি অ্যাম্বুলেন্স,ভূতের নাতি ওঁ চিঁ।গল্পগ্রন্থ:তিথি ও একটি আঙুল, পুরষ্কার: মহাত্মা গান্ধী স্বর্ণ স্মারক ২০১৬।
গুচ্ছ কবিতায়
প্রতিচ্ছবি
কিছুটা অন্ধকারে আলো এসে দাঁড়ালো আজ!
রেললাইনের পাশে ছোট্ট ঘুমন্ত চাঁদ
চোখ খুলে বলে, আহা! কী যে ভিন্নতর এই জোছনার আকাশ।
হুইসেল বাজাতে বাজাতে থেমে গেল একচিলতে ঘোর
একাকী ভৈরব পাল তুলে দিল
বহুদূর ভেসে গেলো সিলভিয়া প্লাথ।
মধ্যরাতে মিহিসুর, আশাবরী রাগ
জলে পুড়ে ছাই হলো প্রিয় রুবাইয়াৎ,
আলো হেসে বলে, আহা কী যে ছিল একদিন!
কোথায় গেলো? তোমাদের সেই নম্র স্বভাব?
কফিনের অন্তরাল
(কবি শহীদ কাদরী স্মরণে)
বিচ্ছিন্নতার কাল পেরিয়ে আকাশের কোনে কোলাহলমুখর চাঁদ
খরতাপ জোছনায় একটু একটু ডুবে যায় নৈঃসঙ্গের ঢাক
যে দূরত্ব জীবিতের নিঃশ্বাস ঘিরে
মৃত্যু তাকেই ছড়িয়ে দেয় মহাসাগরের জমাট শূন্যতায়
অভিমান আর অহংকারের ঝলসানো চিৎকার ক্রমাগত নিস্তব্ধ
কফিনের অন্তরালে।
স্বদেশ আর স্বদেশহীনতার দ্বন্দ্ব কাটিয়ে একাগ্র উষায়
এ কার দৃষ্টি বদলের চিহ্ন?
আমাদের লোকায়ত করে, বিপন্ন, বিষন্ন করে
আমাদের প্রজন্মতাড়িত ভাবনার ভাঁজে প্রশ্নতাড়িত ঘোর
কখনও দ্বৈরথ ভাঙে, কখনও উলম্ব রেখা ধরে ছুঁতে চায়
পূর্ব স্বীকৃত মেধার আকর
দৃষ্টি বদলে দেয়া তোমার ভার্জিন পথ
লুপ্ত হতে হতেও শিমুল তুলার খাঁজে উড়ে উড়ে
স্বদেশের সবুজ প্রান্তরে ছড়িয়ে যায়।
দ্বৈত বীজের ভেতর থেকে আবহমান আনন্দের ধারা নিয়ে বেড়ে ওঠা এই তুমি
নাগরিক শয্যা থেকে ছিটকে পৌঁছে যাও প্রজন্মের স্মারক সভায়।
সুবর্ণগ্রাম
খোলা আকাশের নীচে তুমি এক খন্ড বস্ত্রের আকার!
নিস্তব্ধতার হৃৎ পুকুর হয়ে জড়িয়ে রয়েছো মসলিন মায়ায়
সুবর্ণগ্রাম,
তুমি উন্মোচিত আকাঙ্ক্ষর ভেতর থেকে নেমে আসা কুয়াশা জমিন।
খাসনগর দীঘির পাড়ে ভোরের সূর্য আলো খেলায় মেতেছিল সেদিন
হাতকোপা গ্রাম থেকে রঙিন পায়রার ঝাঁক উড়ে গেল
পানাম নগর পেরিয়ে
মসলিনে মোড়ানো প্রান্তর অকস্মাৎ সূর্যমুখী আলোর ফোয়ারা বেয়ে
নেমে গেল মেঘনার বুকে
সুবর্ণগ্রাম, তুমি দূর জন্মে বেড়ে ওঠা বিনাশের প্রতিধ্বনি
ছড়িয়ে রয়েছো জীবনের ক্ষয়িষ্ণু ভিটায়
৫৫ হাজার বর্গমাইল জুড়ে যে বিস্ময়ের তোপধ্বনি আমার স্বপ্নঘোরে
সুবর্ণগ্রাম তুমি তারই রেশ, আমার প্রাচীন ভূমি।
ঈশাখাঁর ঝলসানো তলোয়ারে ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত ধড়
জ্যোস্না ফোটা নীরব অন্ধকারে আমাদের পায়ের কাছে
যেন বেদনার বিশুদ্ধ গোলক লুটোপুটি খায়
খাঁজকাটা সুপ্রাচীন এক তাঁতঘরে।
সুবর্ণগ্রাম, তোমার পথে পথে শিশির সন্ন্যাস
তাঁতীদের অবিস্ফারিত দীর্ঘশ্বাস, কাটা আঙুলের ছাপ
সুবর্ণগ্রাম, তুমি না ফোটা আলোর পল্লব
চোখে লেপ্টে থাকা গুনগুনে বিরহগীত
জয়নুলের স্বপ্নপূরণের লোকায়ত ইতিহাস!
তুমি ঋষিপাড়ার সেই মন্দির পাঠশালা
যেখানে ছোট্ট কোমল মেয়েটির মুখে দেখেছিলাম
শ্যামল নিবিড় একটুকরো বাংলাদেশ।


Comments
Post a Comment