নাগসেন

নাগসেন

জন্ম:-১৯৬৯ সালে, বঙ্গোপসাগর ছুঁয়ে থাকা সাগরদ্বীপে। আসল নাম দেবদুলাল পাঁজা । 'নাগসেন' ছদ্মনামেই বরাবর কবিতা লেখেন।নব্বই দশকের কবি।একসময় সম্পাদনা করেছেন 'শতাব্দীর মুখ 'এবং 'কবিতা এবং কবিতা 'নামের দুটি বিশিষ্ট সাময়িকপত্র।পেশা : শিক্ষকতা। প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ:-'নিরুৎসব স্বগতকথন ', 'এণ্ডিগেন্ডিদের কথা 'এবং 'স্পর্শের নিকটে একা জন্মান্তর '।প্রথম কবিতাগ্রন্থটি রামমোহন ফাউন্ডেশান এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যৌথ উদ্যোগে ২০১৫বর্ষে ক্রয় করে নির্বাচিত কিছু পাঠাগারে রাখা হয়েছে। ২০১৬-তে স্বপ্নকুঁড়ি-র আমন্ত্রণে বাংলাদেশের ঢাকা, বিক্রমপুর ও বরিশাল গেছেন কবিতার জন্য। লাভ করেছেন "কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী সম্মাননা :২০১৫"। অতি সম্প্রতি কুসুমের ফেরা পত্রিকার পক্ষে আন্তর্জাতিক ইলিশ উৎসবে এই কবিকে প্রথম বার "কবি উৎপলকুমার বসু স্মৃতি পুরস্কার "-এ সম্মানিত করা হয়েছে। কবিতার পাশাপাশি ছোটগল্প এবং কবিতা-বিষয়ক গদ্য রচনায় এই কবির আগ্রহ রয়েছে। করে চলেছেন কবি সামসুল হক বিষয়ক গবেষণাধর্মী একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজও।



নব্বইয়ের নহবতের প্রবন্ধ:
কবি নাগসেন

 নব্বইয়ের ৯:একটি গদ্য-কোলাজ    

বাংলা কবিতার আলোচনায় দশকভিত্তি জীবনানন্দ পরবর্তী সময়ে প্রকটতর হয়েছে। উচ্চতা যখন আকাশচুম্বী হয়ে যায় কবির তখন কোন দশকের খোলস লাগেনা বলেই বিশ্বাস করি। কিন্তু আমরা অধিকাংশই সেই সব অল্প সংখ্যক তারকা কবিদের তুলনায় প্রতিভায় ও সৌকর্ষে বামন। জীবনে সামান্য কিছু পাঠকহৃদয় ছুঁতে পারা কবিতা হয়তোবা আমরাও লিখেছি ভেবে শ্লাঘা বোধ করি--- রাত্রিতে শান্তিতে ঘুমোতে যাই। 

এরপরেও ফন্দিফিকির আছে নানান রকম। ভালো লিখলেই যে আপনি থাকবেন এমন কোন কথা নেই। দশক ভিত্তিক নানান কবিতা সংকলন বাজারে অসংখ্য রয়েছে। সেগুলো একটু উল্টেপাল্টে দেখলে দেখবেন শতকরা নব্বই জনকে আপনি চেনেন না। সেটা বড় কথা নয়।এই নব্বই জনের আবার আশি জন যে কবিতা লেখেন আপনার চারপাশে অনেকেই তাঁদের থেকে ভালো লিখেও কোনদিন পাদপ্রদীপের আলোর সন্ধান পেলেন না। নব্বই দশকের পেটমোটা কবিতা সংকলনগুলির কিছু কিছু দেখেছি। সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলার ইচ্ছে সংযত করে এই দশকের স্বল্প আলোচিত ন'জন কবিকে নিয়ে একটি গদ্য- কোলাজে এবার প্রবেশ করি।-- 



 

কবি আশিস মিশ্র প্রেমে ও প্রতিবাদে বাংলা কবিতায় অচেনা মুখ না হলেও যতখানি আলোচনা তাঁর প্রাপ্য ছিল তা তিনি পাননি। একটি বড় কবিতা উৎসবের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে মেদিনীপুরের এই কবি দুই বাংলার বহু মানুষের সঙ্গলাভ করেছেন। সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে জীবিকা তাঁকে ঘাড় ধরে লিখিয়ে নিয়েছে অসংখ্য গদ্য-পদ্য। 


"এতদিন তুমি পাথরের ঘ্রাণ /নিলে, তবু পাথর চিনতে পারলে না।" যেমন লিখতে পারেন আশিস আবার তিনি লেখেন, "চারপাশে ভাঙাচোরা গাছ/ গাছগুলির মন ভালো নেই/ আমাদের নদী মাঠ খেত/ ডুবে যাচ্ছে সাতসকালেই।" আশিসের মগ্ন প্রেমের ভাষায় মুগ্ধ হই যখন তিনি লেখেন, "বৃষ্টির ঠোঁটের কাছে কখনো জল্লাদ/ ফাঁসির দড়ির মতো থাকেনা থাকেনা;/ কবি তো তোমার জন্য মরেও মরে না।" কিংবা "চোদ্দটি মাত্রার মতো ঝরেছিলে কাল/ আজ কেন মুখ ভার সকাল সকাল?" 'প্রেমিকা-প্রেমিক সরণি' হোক এই কবি যেমন চান, তেমনি চান ' মিশন টু পোয়েট্রি ' ; আর নিজেকে তিনি সমাহিত রাখেন এই ভাবনায়--- "একা একা এক জীবন্ত পুতুল, সেজে গুজে থাকি/ কেউ ডাকে নড়ে চড়ে উঠি, আর কিছু এঁকে রাখি।" ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে অখন্ড মেদিনীপুরে জন্ম কবি আশিস মিশ্রের।প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ন'টি। দীর্ঘকাল 'সাপ্তাহিক আপনজন' নামে একটি সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত সহযোগী সম্পাদক হিসেবে।পেশায় একটি অসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মী।

 

আবু রাইহানের জন্ম ১৯৭০ সালে মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রামে। পেশায় একটি বেসরকারি কলেজের আধিকারিক। দৈনিক 'দিনদর্পণ' সংবাদপত্রের সঙ্গে সম্পাদনাসূত্রে সক্রিয়ভাবে যুক্ত।জীবিকার গোলকধাঁধাকে সামাল দিয়েও প্রতিদিন হাজার হাজার অক্ষর লিখে চলেছেন এই কবি ও প্রাবন্ধিক। কবিতার পাশাপাশি বিচিত্র বিষয়ে প্রবন্ধ লিখে সম্প্রতি দু'পার বাংলায় আলোচনা পাচ্ছেন এই কবি।কবিতা তাঁকে অমরত্ব দেবে কিনা তা একমাত্র বলতে পারে মহাকাল। তবে গদ্য রচনায় তাঁর পরিশ্রম যে বৃথা যাবে না তা বাজি রেখে বলা যায়। যতই গদ্য লিখুন আবু রাইহানের বেঁচে থাকার জিয়নকাঠি তবু কাব্যলক্ষ্মীর পদতলে ভোরের আলোর মত খেলা করে জলজ রেখায়। আবু রাইহানের মাত্র দুটি কাব্যগ্রন্থ এখনো পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে।প্রকাশিত হয়েছে ' বাংলা কাব্য সাহিত্যে ইসলামী সংস্কৃতি ও সমাজ' নামে একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ। 'কান্নার ঢেউ' স্মৃতির পাথরে চেপে রেখেই আমাদের এই কবিজন্ম প্রসারিত হয়। বসন্তে যেকোন কবিকে রাত্রি দিন দহন যন্ত্রণায় রক্তক্ষরণের কাল যাপন করতে হয়। একজন কবিই বলতে পারেন--- "আমারই ভালোবাসায় চষা, এই আদিগন্ত উর্বর শস্যভূমি!" শুদ্ধ চেতনার অস্তিত্ব সংকটে পৃথিবীর যেকোন সংবেদনশীল মানুষের মতোই এই কবিও 'অনস্তিত্বের পারমাণবিক ধূলিকণা' হয়ে ভেসে বেড়ান 'নিজস্ব ফসলের মাঠ' বরাবর। 'দূরে বন্দরের মায়াবী আলোয়' যে অলৌকিক রহস্যময়তা সেই তো আমাদের প্রিয় মহাকাব্যের মলাট।অতলান্তগামী কবিকে তাঁর প্রিয়জনদের উদ্দেশ্যে এই ঘোষনা করতে শোনা যায় যে, পৃথিবীর কোন আশ্রয়ই নিরাপদ নয়। আর সেই কারণেই তিনি কবিতায় লিখে রাখতে চান 'ভালোবাসার এবাদতনামা'। 'নিবিড় রাত্রির গভীর নির্জনতা ঘেঁটে' এই কবি কবিতার নিবিড় আলিঙ্গনে জড়িয়ে থাকুন ভালোবাসার নিষিক্ত প্রহরে।


কবি বিশ্বজিৎ রায় তাঁর নির্মাণের সততায় নব্বইয়ের একজন উজ্জ্বল কবি।জন্ম: কলকাতায়। সাল ১৯৬৩। পেশায় সরকারি কর্মচারী এই কবির অদ্যাবধি প্রকাশিত কবিতা গ্রন্থের সংখ্যা ৮টি। "আহত সংজ্ঞার ভেতর নিজেকে দেখি/ আলোড়নপিষ্ট মানুষ/ নির্মোহের  মুখোশ পরে কিভাবে গতিশীল/ লাল নীল সবুজ খেলার রাস্তায়"--- যথার্থ দৃশ্য হয়ে ওঠার বাসনা থাকে একজন কবিতা প্রাণ মানুষের। কবি বিশ্বজিৎ রায়ও "সমস্ত জ্ঞান ঢুকিয়ে দেব ওদের চোখের ভেতরে" এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে হাঁটতে থাকেন চৌমাথার দিকে। এই দুঃসময়ে বন্ধুস্বর একটি দুর্লভ বস্তু। তৃষিত নদী যেমন প্লাবনের উৎস পথ খুঁজতে থাকে, কবিও ভালোবাসার আলো মাখা বন্ধুস্বর খুঁজে বেড়ান আজীবন।

এই যাত্রাপথে কবির গায়ে তুলো কণার মত লেগে লেগে যায়

' ঈর্ষা, প্রদাহ, ক্লেদ, কটাক্ষ, ক্ষরণ ও অপমান '। ভালোবাসার জন্য কবি বিশ্বজিৎ রায় হতে পারেন একটি একাগ্র কুকুরও---যদিবা 'এ জীবন কারো পাশে পেতে/ যায় কিনা বসা কিছুক্ষণ'।কথিত আছে একজন কবি সারা জীবন ধরে একটি কবিতাই লেখেন। একটি কবিতা কবির কাছে একটি মেগা-সিরিয়াল। যে মেগা-সিরিয়ালের ভেতর থেকে যাবে আমাদের দিনকাল, ভেঙে পড়া সেতু এবং ছিঁড়ে যাওয়া পাল।' সব বিচ্ছেদের, সব মিথ্যার, সব বৃষ্টিকণার' বিরুদ্ধে একজন কবির যুদ্ধ। যতই 'গোখরো সাপের মতো' ফণা তুলে থাকুক দিন, কবির মাথা থেকে কেউ ব্রহ্ম বিদ্যালয়ের আগুন নেভাতে পারবে না। 'বোবা গ্রাম থেকে নিঃশব্দে ফেরে রাত' আর আমরা পৌঁছে যাই লাগাম ছেঁড়া ঘোড়ার গন্তব্যে। কেননা কবির কোন গন্তব্য নেই।সময় হল সেই লাগাম ছেঁড়া ঘোড়া। এই কালবেলায় 'নিজেই নিজেকে শুশ্রূষা' দিয়ে এগিয়ে চলুন কবি বিশ্বজিৎ রায়।


কবি কবি সোনালী বেগম থাকেন বাংলা থেকে বহুদূরে গাজিয়াবাদে। জন্ম ১৯৬৪। জন্মস্থান: বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ। প্রকাশিত কবিতা গ্রন্থ ১৮টি।বাংলা কবিতায় আবহমানকাল ধরে তুলনামূলকভাবে নারীদের প্রতিনিধিত্বের হার যথেষ্ট কম। হতে পারে তা সামাজিক কাঠামোর কারণে। আবার 'কবিতা' এই শিল্প মাধ্যমটি সেই অর্থে তাদের আকর্ষণ করেনি--- এমনটিও হতে পারে।পাখির চোখকে আরো নিবিষ্ট করলে দেখতে পাই যে--- মুসলমান সম্প্রদায় থেকে বাংলা কবিতায় এসেছে, অন্তত এবাংলায়, এই সংখ্যাটি অতি বিরল। সোনালী বেগমকে ধন্যবাদ তিনি  শিক্ষা, পারিবারিক সমর্থন এবং কবিতার প্রতি ঐকান্তিক ভালোবাসা নিয়ে দীর্ঘ সময় বাংলা থেকে বহু দূরে থেকেও বাংলা কবিতাকে জড়িয়ে রেখেছেন শরীরে ও সত্তায়। 

"মাটি জল বাতাস গাছপালার ভেতর ছড়িয়ে পড়ছে বিকীর্ণ অদৃশ্য সব সংযোগ। অসম্পূর্ণ এই ভাগফল।"--- দেখে কবি সোনালী বেগমের সিদ্ধান্তে আসতে দেরি হয় না যে---" না, মালবাহী ঘোড়া বা বেতনহীন গৃহবধূর কোন শিক্ষকের দরকার নেই।" এই কবি অনায়াসে বিচরণ করতে পারেন মির্জা গালিব থেকে ওমর খৈয়াম, রুমি থেকে সুন্দরবনের পাখিরালয়। সিমলা-দেরাদুনের প্রাকৃতিক বিহ্বলতা যেমন এই কবি সংক্ষেপে আঁকতে পারেন, তেমনি তাঁর চোখ এড়ায় না শিশির সিক্ত রক্তিম আপেল। তাঁর থেকেও জরুরী পর্যবেক্ষণে তিনি যখন লেখেন "ল্যাম্পপোস্টের আলোয় বাচ্চা---কোলে যে নারীটি দৌড়োচ্ছে সে নিশ্চয় কোনো অভাগী মা।"--- বেশ লাগে এই সংবেদনশীল মনের হদিস পেয়ে।" দীর্ঘদিন খনি গর্ভে কাটিয়ে যে/ খনি শ্রমিক ঘরে ফিরে এলো, সে/তো নবজন্ম"--- আমাদের সামাজিক দুর্ভাগ্যের এই লিখন কবি তাঁর মত করে লেখেন। কলঙ্কিত চির নিদ্রায় শুয়ে থাকা কিশোরী--- কম্বলের নিচে চাপা পড়ে আছে যার সমস্ত ক্ষত, কবির চোখের জল তার শূন্য ঘরে ঝরে পড়ে। আর তারও পর একজন কবিকে তাঁর লিখন প্রক্রিয়া জারি রাখতে হয়। আরো আরো লিখুন সোনালী।

 

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব বর্ধমানের সমুদ্রগড়ে জন্ম কবি রুদ্র কিংশুকের। বর্তমান নিবাস বোলপুর। পেশা: শিক্ষকতা। প্রকাশিত হয়েছে ১০ টিরও বেশি কাব্যগ্রন্থ।


 'পৃথিবীতে আরও আরও বন' আরও 'পাখি ও মৌচাক' চান কবি রুদ্র কিংশুক। কবির অতৃপ্তি তাঁর সমস্ত পারানের কড়ি। সারা রাত লাল সাদা ভাল্লুক বইয়ের তাক থেকে লাফিয়ে নেমে বলে চলে 'হচ্ছে না, কিচ্ছু হচ্ছে না'। কবিকে ঘোর অতৃপ্তি নিয়ে তাই আবার অনুশীলনে ডুবে যেতে হয়। এই কবির চিত্রকল্প রচনার দক্ষতা মুগ্ধ মগ্নতায় পাঠককে জারিত করে রাখার জাদু জানে। তিনি লেখেন--- "খরগোশ কাছিমের গল্পে রুপু রেখে দিচ্ছে/ বাটি ভর্তি কিসমিস, ঘুম ঘুম কাজুর সুগন্ধ" কিংবা "ইথারে জাহাজ, চিহ্নপাখিদের বাসা ও উড়ান"। সমাজ বদলের স্বপ্ন সম্ভব হলো না বলে কবির যে অতৃপ্তির ঢেকুর ওঠে তাতে বিষ ও লোনা গন্ধ সময়কে হয়তোবা ফুটিফাটা করে দিতে দিতে বলে---" ছায়া দেখে ছায়া দেখে অন্ধেরা রাস্তা পার হল,/ সেতুর ওপরে হাটগামী ভেড়ার দঙ্গল/ তাদের রং ও পেচ্ছাবের গন্ধে বাতাস/ আন্দোলিত"।


বোলপুর জুড়ে অমলতাস--- কবি রুদ্র কিংশুক প্রার্থনা জানান--- আমার এ অলীক আন্তর্জাল, বিহু থেকে বহু নির্বাচন/ ফিরে এসো আবার বাণী'র অমলতাসে… "। রুদ্র-এর কবিতার ভাষা বরাবরই ঋজু, নির্মেদ এবং অন্তর্স্পর্শী। শুধু নব্বই কেন পরবর্তী সময়ের কবিদের মধ্যে এই গুণ হাতে গোনা কবিদের মধ্যে আছে।

ছুঁড়ে দেওয়া অব্যর্থ গুলির মত তাঁর কবিতাপংক্তি পাঠকের ডান অলিন্দ-বাম অলিন্দ ফালাফালা করে দেয়---"গহরজান, বারবার ব্ল্যাকহোল থেকে তুলে/তুমি আমাকে ছুঁড়ে দিচ্ছ ঘুম- কবিতার দিকে" অথবা " পান্নালাল দাশগুপ্ত হাঁটছেন, কাঁধে মেঘ/উপচানো অজয়,পান্নাবাবুর শরীরে বিদ্যুৎ"। কবি রুদ্র কিংশুক সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আমিও ক্রমশঃ উপচানো মুগ্ধতার ধারাজলে স্নাত হচ্ছি।কবির কথাতেই শেষ করি এইভাবে---"অনুরাগ উজ্জ্বল ওই কম্পিত অক্ষরের নীচে বহুকাল/ চাপা আছে আমার সংযমী অক্ষর,লাজুক"।


নব্বইয়ের আরেক স্বল্প আলোচিত কবি অরূপ দত্ত। জন্ম ১৯৬৯, দক্ষিণ পরগনার কামারপোল গ্রামে। প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ ৩টি।


"কথারা প্রসব করে কথা/কথারা জবাববিহীন" জেনেও কবি অরূপ দত্ত এই 'বিপণন আর পদোন্নতির যুগ'---এ লুকিয়ে থাকা ঘৃণাকে ছড়িয়ে দেন শিউলি ফুলের ভোরে। প্রাচীন কচ্ছপের শূন্য পিঠে যে বিষাদ আর 'ছদ্ম করুণায় মাছেরা তার কাছে আসে' যখন, আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভন্ড সন্ন্যাসীদের কথাই কবি স্মরণ করিয়ে দিতে চান। পারা না পারা পরের কথা। কবির হৃদয়ে তবু সমাজ বদলের নীল নকশা আঁকা থাকবেই। ভোট বা নির্বাচন বেয়ে যে গণতন্ত্র আর প্রতিশ্রুতির ইশতেহার যে শেষ পর্যন্ত মুড়ির ঠোঁয়ায় আমাদেরই মত অসহায় আত্মসমর্পণ করবে তা কবির অজানা নয়। 

কবিতায় সোচ্চারে বা মগ্নতায় সময়ের ছবি আঁকতে পারা নিঃসন্দেহে এই কবির একটি বড় কাজ।বাস্তব থেকে পরাবাস্তবের দিকে যেতে যেতে কবি অরূপ দত্ত লেখেন "এই প্রবল শীতের মধ্যেও/জেগে আছে রাত/ভন ভন মাছি,/সোনাগাছি আর ফুটপাথ"  কিংবা "গণতন্ত্র জানে, এ অন্ন/স্নেহহীন, গন্ধহীন,/বর্ণহীন নয়।" তাতে "সন্দেহজনক রং লেগে থাকে"।সন্ত্রাসবাদ আর চোরা অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া অজস্র প্রাণের কথা বলে আঁধারজঙ্গল। সেখানে যে চাঁদ ওঠে তার চেরা জিভে অনেক রক্ত।সময় বদলালে হয়তো সেই চাঁদই "মায়ের টিপের মত হবে"।


সময়ের ভ্রষ্টাচার---চতুর্দিকে মানুষের শেকড় ছেঁড়া আর্তনাদ কবি অরূপ দত্তকে এক প্রবল হতাশায় নিমগ্ন করে। তিনি যেন গভীর জঙ্গলে এক কুহকমায়ায় ফেঁসে যাওয়া বন্য কবুতর।কবিকেও তৃতীয় নয়নের কুয়াশা-বিদারক আলোকরশ্মিতে সময়ের রক্ত-পুঁজ ঠেলে নতুন দিনের ভোরে পা রাখতে হয়। সম্ভবত মানসিক অস্থিরতায় একসময়ের সক্রিয়তর কবি অরূপ দত্ত এখন অনেকটাই নিভৃতচারী। তিনি আলোয় আসুন---কবিতার উঠোন জুড়ে আবার তাঁর নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে আলো হোক, ভালো হোক, এই প্রত্যাশা রাখি।


মুহম্মদ মতিউল্লাহ্ নব্বই দশকের একজন কবি।জন্ম--১৯৬৭। কবিতাগ্রন্থ ১১টি, সম্পাদিত গ্রন্থ আটটি।

' দুরন্ত বাতাসের দিকে' যখন পালকি চলে তখন বিবাহের দিন এসে যায় একজন কবির। যৌবন উন্মনা হয়--- ডোমনির সমীপে আসে এক বিবাহযাত্রা। 'শীতের দিকে মেঘ করে এলে' অকাল বর্ষণের কালে সন্তানকে রক্ষা করার জন্য কবি দেখেন 'সমস্ত উদ্বেগ নিয়ে/ মা কোথাও দাঁড়িয়ে আছে…।' পাওয়া না পাওয়ার মাঝখানে দাঁড়িয়ে মতিউল্লাহ্ আবিষ্কার করেন 'অশ্বথ্থপাতা অনন্ত কাল ঝরে ঝরে পড়ে' কিংবা 'বামদিকের পৃষ্ঠায় দুলছে একটি জীবন/ অসম্পাদিত বাঁচা মরা, অনিকেত দীর্ঘতা'।


শৈশব স্মৃতি মতিউল্লাহ্-এর কবিতায় একটি বড় উপাদান।'দশ ইউনিট ইনসুলিন' নিয়ে ঘুমোতে যাওয়ার আগে' কবির মনে পড়ে যায় 'শৈশবের জামগাছটির কথা'। তৈরি হয় এক বিষণ্ন চিত্রকল্প, কবি যখন লেখেন--- 'অচেনা একটা জাম গাছ, মায়ের নিষেধাজ্ঞা স্মৃতি নিয়ে/ গভীর রাতে তুমি ঘুমোতে যাচ্ছ'। বিষন্নতা ছাড়া একজন কবি কখনো পাঠকের হৃদয়ে চিরন্তন আসন লাভ করতে পারেন না। কবি মতিউল্লাহ্ সে বিষয়ে বেশ সচেতন। কবি লেখেন, 'কলরব এক মস্ত ছায়া, তুমি সেখানে ঘুমিয়ে আছো/ আমি খুব ভেবেছি, তুমি কেমন আছ।' "অনাদিবাবুর বাগান বাড়ি" কবিতায় স্মৃতি আর সময় হাত ধরাধরি করে আঁকতে থাকে বিষণ্নতা। জলচৌকির পাশে ঘুমিয়ে পড়া শস্ত্রশীর্ণ কাপালিকতো আমরা সবাই। আরো দূর দীর্ঘতা খুঁজে চলেন প্রত্যেক সার্থক কবি---খুঁজে চলেন 'সমস্ত চলার মধ্যে ছুটি আর সমস্ত প্রহরের মধ্যে অবকাশ।হাতার গায়ে সাদা শিউলির মত লেগে থাকা ভাত কবির দৃষ্টি এড়ায় না। 'এক সময় এঁটো থালাবাটির সঙ্গে হাতাটি চলে যায়/ বেসিনের তলার গোপন অন্ধকারে' লিখে কবি মুহম্মদ মতিউল্লাহ বুঝিয়ে দেন সংসারের খুঁটিনাটিতে তিনি খুঁজতে আছেন কবিতার জুঁই ও বেলি। 'একটি রিকশা চলে গেল দূরের রাস্তায়' আর 'ধর্মগ্রন্থের পাতায় বিবর্ণ কারুকাজ' মনে করতে করতে পিঁপড়ের হৃদয় নিয়ে আমরা আজীবন জড়ো করতে থাকি 'সবুজ মদের মতো ঘাসবীজ'।


গ্রাম ও শহর, সময় ও পরকাল পেরিয়ে মুহম্মদ মতিউল্লাহ্ এঁকে চলেছেন এক বেলা অবেলার কাব্য। বাংলা কবিতায় আরো কত মতিউল্লাহ্---এর মত স্বল্পালোচিত কবি রয়েছেন তা ভেবে শিহরিত হই। এমনই নিচু ও মগ্ন স্বরে মতিউল্লাহ্ 'দুপুরবেলার দিঘি' হয়ে আমাদের হৃদয়ে থাকুন এই প্রত্যাশাতেই থাকতে চাই।


২০০০ খ্রিস্টাব্দে 'জাতক কাহিনী' কবিতা গ্রন্থের মধ্য দিয়ে এবং কচ সান্যাল ছদ্মনামে বিশ্বজিৎ মাইতির কবিতা যাত্রা শুরু হয়েছিল। নব্বই দশকের এই কবির জন্ম ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে। অদ্যাবধি প্রকাশিত কবিতা গ্রন্থের সংখ্যা ১২টি। পেশা- অধ্যাপনা। কচ সান্যাল অচিরে আবার ফিরেছেন বিশ্বজিৎ মাইতি নামে। বিশ্বজিতের কাব্যভাষা ইতিমধ্যেই স্বকীয়তায় উজ্জ্বল এবং তাকে চেনার জন্য তাঁর কাব্য ভাষাকে অনুসরণ করা ছাড়া উপায় নেই। "মেঝেময় ছড়িয়ে পড়ে সিকি ও আধুলিসহ শুকনো নাগচাঁপা/ মকরবাহন দেবী, পাথরে বমন কষ্ট তুমি লুকিও না।" প্রথম কবিতা গ্রন্থেই এ মতো উজ্জ্বলতা নিয়ে এই কবি শুরু করেছিলেন। বাংলা লোকায়ত কথা ও কাহিনী বিশ্বজিতের রক্তে ও মজ্জায়। তিনি তাই অনায়াসেই লিখতে পারেন--- 'পদচিহ্ন ফুটে উঠছে পাটাতন দেহে/ পুঁটলিটি ছেড়ে গেছে গলুইয়ের ফাঁকে/ অন্নপূর্ণা তিনি তবে! শিবের ঘরণী।' প্রেম ও পুরাণকে বিশ্বজিৎ তাঁর অঙ্গাভরণ করে রাখেন। 'আমি এ ছাতিমতলে মেয়েটির জন্য দাঁড়াবো। ওর তো কষ্ট হবে খুব দুপুরে নির্জন পথে একা হেঁটে যেতে।' কখনো কখনো ভাষাকে কিছু মাত্র তরল করেও বিশ্বজিৎ তার কাব্যসুষমাকে উজ্জ্বল রাখেন। তিনি লেখেন--- 'মেজাজের ধার ধারি খুব/ মেজাজের পায়ে নমস্কার/ মেজাজের জলধি অতল/ ভীতু আমি সাঁতার না জেনে/ ডুবে যাই অতলে তাহার/ জাপটে ধরি তাকে।' 


বিশ্বজিতের কবিতায় বারবার তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের নানান অনুষঙ্গ চলে আসে। আসে সেইসব মায়াময় দিনযাপনের কথা--- 'চই চই জলহাঁস সোনাঝুরি সরোবর ছেড়ে/ আমার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে/ লাইব্রেরী ও আম্রকুঞ্জ তলে'। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লিখনভঙ্গিমাও বারবার আধুনিকতার স্বপক্ষে বদলেছেন বিশ্বজিৎ। প্রথমদিকে তাঁর কাব্য ভাষায় যে ক্লাসিক্যাল প্রাচীনতার ঝোঁক ছিল, ক্রমে তা নরম ও মায়াময় হয়েছে। তিনি তখন লেখেন--- 'প্রথম বৃষ্টিতে তার মন ভিজে গেল/ চোখের পাতায় এসে জলকণা ঝাপট দিল যেই,/ না-না আমি সঙ্গে ছিলাম না সে সময়ে/ সঙ্গে তো দিদি ছিলো তার'। অথবা 'হলুদ পিঁপড়ে তার পায়ে পায়ে/ নীল পাখিটির চিঠি শিরীষ পল্লবে রেখে যায়/ একান্তই অসংযোগী সেই দৃশ্যের সামনে/ লজ্জায় কুঁকড়ে যায় একটি যুবক।'


প্রেম ও প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়েও বিশ্বজিৎ তাঁর কবিতায় কখনো সমকাল ও সমাজ বেদনাকে অবজ্ঞা করেননি। নন্দীগ্রাম পর্বের নিকট দূরত্বে থেকে দেখেছেন বোকা মানুষটির কান্না আর রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচার। 'বোমা ও গুলির শব্দে সন্ত্রস্ত গ্রাম জেগে থাকে। একটি ময়ূরী তার সঙ্গীটির ফেরার আশায় রাত জাগে।' কিংবা, তিনি লেখেন--- 'সে কারণে ধরা পড়া দশজন ভাড়াটে ধর্ষণকারী ও বন্দুকবাজের দায়, সরকারি হিসেবে চোদ্দজনের মৃত্যুর দায়, অসংখ্য নিখোঁজের দায়, লাশ গায়েবের দায় এবং ঘরছাড়াদের দায় নিতে হয় তাকেই--- মস্তিষ্কে যিনি প্যারাসাইট ঢুকিয়েছেন।' রাজনীতির নোংরা অন্ধকারের দর্শন ও দিগ্বলয়  পেরিয়ে তবুও একজন কবিকে লিখতে হয়--- 'ধান্যখোলা, নন্দীগ্রাম, বরজ, তেরপেখ্যা, সোনাচূড়া, গোকুলনগরের ঘরের ছাউনি, মাটির দেওয়াল ঘিরে কালো রোগা লোকেদের স্বপ্ন জেগে থাকে।' কিংবা 'বারো হাত কাঁকুড়ের দেশে/ তেরো হাত, বিচিদের বারফাট্টাই দেখে/ মুগ্ধ হয় জনগণমন।'

বিশ্বজিৎ মাইতি নব্বই দশকের একজন অগ্রগণ্য কবি। তিনি অনায়াসেই তাঁর 'ক্যানভাসে ডালিম বর্ণের ঝিলিক' তুলে ধরতে পারেন। আর তা পারেন বলেই তিনি ভুলতে পারেন না 'মালদহের বান্ধবী মিনু আহমেদের মুখ' আর 'বিল্বদল মধ্যে একটি কীট/ অতিশয় সংগোপনে প্রবেশ করে' দেখেও তিনি কথামৃতের পাতায় লিখে রাখেন--- 'যে সমস্ত প্রাণী নিয়মিত সমুদ্রে সাঁতার কাটে/ তাদের পায়ের পাতা ক্রমশ চ্যাপ্টা হতে হতে/ মাছের লেজের আকার ধারণ করে'। যেমনভাবে 'একটি গাছ পত্র ও ডালপালার সম্ভারে ক্রমপর্যায়ে অরণ্য তৈরি করে' সেভাবে বিশ্বজিৎ মাইতি বাংলা কবিতাকে সবুজ ও সমৃদ্ধ করবেন নিশ্চিতভাবেই।


এই আলোচনার শেষ কবিপুরুষ তাজিমুর রহমান। জন্ম- ১৯৭০। কবিতাগ্রন্থ ৬টি। পেশা শিক্ষকতা। চিরকালই অত্যন্ত নিচু স্বরে কথা বলতে ভালোবাসেন তাজিমুর তাঁর কবিতায়। স্বর নিচু তবে ভাবনায় আছে বৈচিত্রময় সূর্যস্নান। একজন সার্থক কবি তাঁর একই অঙ্গে বহু রূপ ধারণ করে চলেন। প্রেমেও প্রতিবাদে--- বাস্তব থেকে পরাবাস্তবে--- শব্দের ছোট---বড় টুকরোয় তিনি সাজিয়ে তোলেন শব্দময়ীর নির্জন সংসার। আর তাঁর সেই কাজে চিত্রকল্প নির্মাণের দক্ষতা তাঁকে যুদ্ধ পথ অতিক্রমে সাহায্য করে। 'ল্যাম্পপোস্টের ঝুলন্ত টিউবলাইটের আলোয়/ ঝলমল করছে বর্ষার জলে ডোবা রাস্তাঘাট, হাঁটুজল/ ভেঙে বাড়ি ফেরা স্বামীর ক্লান্ত মুখ।' লিখে তাজিমুর বুঝিয়ে দেন তিনি সাধারণ বিষয়কে নিয়ে যেতে চান অসাধারণের দোরগোড়ায়। বিবেকের বদ্ধ অর্গলে করাঘাত করা তাজিমুরের বরাবরের অভ্যাস। তিনি তাই লেখেন---"সময়ের বাঁকে যে সংলাপগুলি আজও অচেনা তাকে অচিরেই/ নস্যাৎ করো, না হলে বুকের আদল ভেঙে জন্ম নেবে বিষবৃক্ষ!" কিংবা লেখেন--- "দৃষ্টি ছড়ালেই নিষ্প্রাণ মুখের সমাহার, বারুদের ঘ্রাণে হাঁসফাঁস করা শৈশব…" 'দহনের একটা নিজস্ব আলো থাকে' বলেই হয়তো কবিরা পুড়তে ভালোবাসেন, পোড়াতে নয়। তবুও তাঁদের সেই আত্মদহনে পুড়ে যায় সমাজ ও সংসারের কত শত আবর্জনা আর অবিবেকী রং মশাল। প্রেম যখন দহন হয়ে আসে তাজিমুর তখন লেখেন---"বাঁধ মেনেছে তোমার রমণ, বাতাসে বড় তীব্র অসুখ/ পুড়েছে মন ভিতর ভিতর অচেনা আজ তোমার মুখ"। অথবা লেখেন--- "বিকেলে তোমার জন্য তুলে রাখবো ফুল/ তুমি এসো, উৎসবে যাবো"। নৈঃশব্দ্য আর রাত্রি কবির এক প্রিয় আশ্রয়। সেখানে এক আকাশদীপ জ্বলে ওঠে তাঁরই জন্য। যখন "...ফাঁকা সড়কের মত করিমবাউল একতারা হাতে নিয়ে/ ফেরি করে যায় কুয়াশার গান, উদাসী সকাল" তখন মানুষ হয়ে কবি দাঁড়াতে চান। আর তখনই অনায়াসে 'ভিজে ওঠে সব ব্যথা'। আত্মপ্রচারের ঢক্কানিনাদ যখন কবিদের অন্যতম শিরস্ত্রাণ হয়েছে ইদানিং, তখন কবি তাজিমুর বুকের কাছে সরে এসে বলতে পারেন--- "অহংকারে নয়, ভালোবেসে আমি/ পার হয়ে যাব/ কবিতার সব কানাগলি"। প্রেমে বা অপ্রেমে আনত এই কবির কান্নাও মেরুনরঙা--- "তোমার ভ্রু-ভাঁজে বিতত যে ভাস/ তার অভিজ্ঞান হোক রামধনু'"। কান্না চেপে রেখে হেঁটে যাওয়া এই কবিকে তাঁরই কবিতার শব্দে বলা যায়- "একা একা নারী,আর বৃক্ষের ভাঁজে বসে থাকা/ পাখি আনমনে জিভ কেটে বলে/ অতটা বিনয়ী নাইবা হলে কবি!"--- এতকিছুর পরও কবি তাজিমুর তাঁর বিশ্বাসে অটল থেকে বলে চলেন- "যে নির্জনতা মাথা তুলে আছে/ আমাদের মাঝে, অনায়াসে/ তার নাম হোক বাউলভুবন"। 

এই সময়ের অন্যতম এক উজ্জ্বল কবি তাজিমুর রহমান নিবিষ্ট পাঠকের কাছে তাঁর ধ্বনি ও অভিমান প্রতিনিয়ত পৌঁছে দিচ্ছেন 'শরবিদ্ধ পাখির মতন'। 'দূরের আকাশে তার চেনা স্বর' ছড়িয়ে দিতে দিতে তিনি মেঠোপথেও কালবিগ্রহ প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। "গড়িয়ে চলা মাটিঢেউ তর্কের খাতিরে সরিয়ে" রেখে আমরাও তাঁর শূন্যতার নিজস্ব পাঠের দিকে দৃষ্টিপ্রদীপ জ্বালিয়ে রাখলাম।



Comments

Popular posts from this blog

কামাল আহসান

সুচিপত্র

মিহির সরকার