নাসিম-এ-আলম


নাসিম-এ- আলম

জন্ম:-বীরভূমের কীর্ণাহারের নিকটবর্তী নিমড়া গ্রামে।নয়ের দশকের কবি হিসাবে পরিচিত।বাংলা ভাষার সব ধরণের পত্র পত্রিকায় লেখেন। দেশ, কৃত্তিবাস, কৌরব,কবি সম্মেলন, প্রতীতি, কবিতা আশ্রম, জিজ্ঞাসা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বীরভূমের প্রতিটি লিটল ম‍্যাগাজিনের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ। পারিবারিক আবহে ছিল সাহিত্যের তন্ময়তা। দাদু সাহিত্যিক এম আবদুর রহমান। মা এর প্রেরণায় সাহিত্য ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ। এ যাবৎ সাতটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। তারমধ্যে 'চাঁদ সদাগর ফিরে আসবে', 'ময়ূর ক্লান্ত মানে বর্ষা শেষ হল','আবার বেদুইন লিখিত' পাঠকের ভালোবাসা অর্জন করেছে। একটি গদ‍্যের বই প্রকাশের পথে। স্ত্রী ফেরদৌসী পুত্র রওনক নিয়ে কবিতা নিমগ্ন সংসার।বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের স্নাতকোত্তর এই কবির জীবন যাপনই হল কবিতা।




গুচ্ছ কবিতায়
কবি নাসিম-এ-আলম



মাটির শপথ ও ঝুমকোলতা


বাতাস দক্ষিণে আজ, সুসময় বয়ে আসে ধীরে

লাঙল জোয়াল নিয়ে যেতে যেতে বুকে বাজে লালনের গান, আরশি নগরে বাস ,আমি সেই

কৃষক-বাউল, পূর্ব পুরুষের টানে গ্রামে আছি

ফসলেই নিমগ্ন বিশ্বাস।


সহনশীলতার নামে ধূপের সুগন্ধ ভেসে আসে

কতবার আঘাত এসেছে আর ভুলে গেছি

ধ্রুপদী পরাজয়, পথের ক্লান্ত কোণে 

আমার বাড়িটি শুধু সীমাহীন ক্ষুধায় রচিত।


স্রোত দাও ময়ূরাক্ষী, কোপাই

ডাক দাও প্রতিবেশী কিষাণ সমাজ

বে‍ঁধে রাখো ঝুমকোলতা

এ মাটি ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।


মনে আছে নীল চাষ, নীল বিদ্রোহ?

মনে আছে বর্গীর লুন্ঠন?

মনে আছে দুর্ভিক্ষ, শস‍্যের বিপদ?

চোখের সামনে আসে জলের জোয়ার

মধ‍্যরাতে শুনতে পাই দোজখের ডাক

ভেসে যায় মাতৃস্নেহ,পালিত পশুরা যত

নষ্ট হয় হলুদ ফসল, ভয়ার্ত কান্নার মাঝে

ঝুমকোলতা কাঁপে থর থর!

এবছর বুঝি আর নবান্ন  হবে না!


খনার মন্ত্রে বিশ্বাস ছিল চিরকাল

সহ‍্য করি অভিশাপ , বিষাক্তের নীল

সবুজে বিশ্বাস আছে কৃষকের আত্মার ভেতর

শস‍্যের সপক্ষে আছে যৌবনের সব অনুরাগ।


এ দেশে বিক্রি হয় মাটি, জল, শস‍্যের নীলিমা

পাখির ডাকের চেয়ে প্রিয়তর মনে হতে পারে

কোনো কাচের শহর, শহরের প্লাস্টিকের গাছপালা,

মনে হতে পারে বহুতলে শুয়ে আছে

সুখ ও সবুজ, ডাহুক ডাকছে মিছিমিছি।


দীর্ঘদিন যে সত্য বলিনি

আজ বলি অভাব 'ই আমার স্বাধীনতা

আমার ঈদ , শারদীয়া,নবান্ন উৎসব

আমার সন্তান আর ঝুমকোলতা

আমার বাসমতি সংগ্রহ

হলুদ তাঁতশাড়ি, মায়ের হাসিমুখ,


ভ্রমর গুঞ্জন করে,গাছে গাছে পাখিদের শিস

শহরে যাব না এই অহংকারে

ঝুমকোলতা ভাত চড়িয়েছে

শুদ্ধতম মাটির উনুনে।



নাগরিক দীর্ঘশ্বাস ও ঝুমকোলতা


আমার প্রতি চুম্বনে রাজনৈতিক বিশ্বাস মিশে আছে

আমার অন্ধ প্রেমিকা বণিক সভার কাছে ঋণী

অবান্তর পাঠশালা বৃদ্ধাশ্রমের বাধ‍্যতা শেখায়

শেখায় যুদ্ধ ছাড়া কি  ভাবে ভূমির দখল নিতে হয়

এরই নাম সভ‍্যতা , এর নাম উত্তর আধুনিকতা।


হাসপাতালের হলুদ বিকেল, চারপাশে ছন্দহীন

যা কিছু, মন খারাপ ছাড়া আর কোনো সত্য নেই

ঝুমকোলতার অসুখ শস্যহীন মহামারী যেন

আধ-পাগল বুড়োটাও জানে -ঐ তো আসছে

শকুনের দল, আসছে জাহান্নামের লিপ ইয়ার।


অথচ জীবন ছন্দময় ছিল

বুদ্ধপূর্ণিমার রাতে অরণ্যে বেড়াতে আসা

পাশে দোবরুপান্না, ভানুমতী,নিজস্ব সারস

আমরা নিকটে গেলে ওড়েনি সে আজও,

ছিল নীলগাই, পাহাড়ি টিলা,সেগুন, শিরিষ, শাল

চেরির সুন্দরতা,একটি আত্মীয়-নদী

চড়ুই, শালিক আর পোকাদের মিষ্টি কুটুম,

রামধনু রঙে কত পাখির শরীর মিশে যায়, মিশে

যায় ঝুমকোলতা, টেরাকোটা গ্রামের শুদ্ধ মেয়ে।


তারপর নরক উন্মোচিত হল

নদী, নদীতীর বিক্রি হল বণিকের কাছে

বিক্রি হল  ভালোবাসার কবিতা সংগ্রহ

বিক্রি হল দাম্পত্যের গোপন গীতিকা।

নগর কবিয়াল লেখো---

অশ্রু বাণিজ্যলব্ধ

শান্তি বাণিজ‍্যলব্ধ

সন্ধ্যার মেঘমালা বাণিজ্যলব্ধ।


তবুও বিশ্বাস রাখি ডানার জীবনে

হয়তো কোথাও খয়েরি বিকেল আছে

মঙ্গলকাব‍্যের শেষ অধ‍্যায়টুকু বাকি আছে ভেবে

ফিরে আসছে বেহুলা, লখিন্দর,

কোথাও ঝুমকোলতার গ্রামে নবান্নের ভোর

বাসমতির ঘ্রাণে জেগে উঠবে অরণ্য জীবন।



ঝুমকোলতার অসুখ


পিপাসা পেয়েছে ,দূরে সাইপ্রাস গাছে শব্দ শনশন

পাতার আকাঙ্ক্ষা জানে বর্ষার ময়ূরী

টেরাকোটা গ্রাম, অলস বিকেল  বিষের পাত্র চিনে 

রাখে, রাখে তৃষ্ণা কাতরতা, ঝুমকোলতা অসুখ।


ছিল বিপরীত ধ্বনির কান্না কিন্তু গান প্রয়োজন

সুস্থতা প্রয়োজন অথচ কপালে নীলাভ মাইগ্রেন

দশ পা হাঁটতে হবে, ঐ তো সমুদ্রের নীল

কলম্বাস আসছেন তোমাকে সঙ্গী করে নিতে।


আবহমান সময় আরোগ্যের ঘুম কতদূর?

হেমন্ত সন্ধ্যায় দুজনে একসাথে যাব

যাব বহুদূর উষ্ণ আর নীলে, সৌন্দর্য পিপাসায়,

অথচ হাসপাতালে রয়েছো বহুদিন

আর আমি বাইনোকুলার হাতে নীলকন্ঠ পাখি

খুঁজছি, অবসন্ন গোধূলির ভিতর,শহর থেকে

দূরে বিপন্নতায়, বাসমতী ঘ্রাণের  নির্জনে।


হরিণের শিঙের মতো বেঁকে আছে সান্ধ্য হাসপাতাল

তুমি জানতে চাইছো শূন্যতা, স্নায়ু বিপর্যয়

আর কবিতার দিগন্তে অসম্ভব বেদনা নির্মাণ

হিমযুগ, ঈশ্বর, সারসের নীলের উড়াল,


কবিতার জন্যে তবে এতকিছু! 

পিপাসা, তুষের আগুন, পুড়ে যাওয়া অনন্ত মোম

প্রাচীরের গায়ে লগ্ন হওয়া শিশু নিমগাছ,


ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ছে ঝুমকোলতার

সুররিয়ালিজমের কাল শেষ হল

ভোররাতে অবসন্ন  শহর জুড়ে বৃষ্টিপাত

সামগ্রিক স্নান প্রয়োজন, 

প্রয়োজন নিমগ্নতা, গৃহের নির্জন।








Comments

Popular posts from this blog

কামাল আহসান

সুচিপত্র

মিহির সরকার